যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে অনুষ্ঠিত “মিডিয়া ফ্রিডম ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি” শীর্ষক এক সংলাপে বাংলাদেশে আটক সাংবাদিকদের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানিয়েছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
গত ২১ মে অনুষ্ঠিত এ সংলাপে বক্তারা অভিযোগ করেন, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তারা বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে এবং সত্য প্রকাশকে অপরাধে পরিণত করা হয়েছে।
বক্তারা আরও বলেন, ২০২৪ সালের সহিংস ঘটনার পর যেসব সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের অধিকাংশই ভিত্তিহীন। এভাবে সাংবাদিকদের কারাগারে আটকে রেখে সরকার গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে বলেও মন্তব্য করেন তারা।
অনুষ্ঠানের মূল বক্তা ছিলেন প্রবীণ ব্রিটিশ সাংবাদিক উইলিয়াম হর্সলি। দীর্ঘ ৩৫ বছর বিবিসিতে কর্মরত থাকা হর্সলি বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে স্বাধীন গণমাধ্যম অপরিহার্য।
তিনি উল্লেখ করেন, “শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল হক বাবু, ফারজানা রূপা ও শাকিল আহমেদের মতো পরিচিত সাংবাদিকরা গ্রেপ্তারের ১৮ মাস পরও কারাগারে রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন। অবিলম্বে তাদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহার না হলে সরকার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে জিম্মি করার অভিযোগ থেকে মুক্ত হতে পারবে না।”
বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের সাবেক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (সিজেএ) যুক্তরাজ্য শাখার নির্বাহী সদস্য রিটা পেইন বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন ও হয়রানি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। নোবেলজয়ী হওয়া সত্ত্বেও অধ্যাপক ইউনূস সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর তার বক্তব্যে বাংলাদেশের গণমাধ্যম আইন, বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের আটক রাখা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি ভিন্নমত, স্বাধীন চিন্তা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে দমনের একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
সাংবাদিক ও সিজেএ সদস্য সৈয়দ বদরুল আহসান বলেন, ২০২৪ সালের অস্থিরতার পর বাংলাদেশে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। তিনি আটক সাংবাদিকদের মুক্তির দাবিতে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নীরবতারও সমালোচনা করেন।
যুক্তরাজ্যের প্রাচীনতম বাংলা পত্রিকা ‘জনমত’-এর সম্পাদক এবং সিজেএর ভাইস প্রেসিডেন্ট নাহাস পাশা সকল আটক সাংবাদিকের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন।
নিউইয়র্ক থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সাংবাদিকদের প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল, ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে দমন করছে।
অনুষ্ঠানের আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয় অস্ট্রেলিয়া থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হওয়া আটক সাংবাদিক শ্যামল দত্তের কন্যা শুশমা শশী দত্তের বক্তব্যে। তিনি জানান, তার বাবা ৬০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে বিচার ছাড়াই আটক রয়েছেন এবং গুরুতর অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
লন্ডন-বাংলা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. আকরামুল হোসেন বলেন, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের জন্য পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল ও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সাবেক মন্ত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শফিকুর রহমান চৌধুরী। তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরতে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।