এসপি পদে পোস্টিংয়ের নামে ১৫ কোটির চুক্তি: নেপথ্যে অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের স্ত্রী ও এক চক্র

এসপি পদে পোস্টিংয়ের নামে ১৫ কোটির চুক্তি: নেপথ্যে অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের স্ত্রী ও এক চক্র

জিয়াউল হক তুহিন : May 16, 2026

পুলিশ কর্মকর্তা ভাইকে পছন্দের জেলায় বদলি ও পদায়নের (পোস্টিং) প্রলোভন দেখিয়ে ১৫ কোটি টাকার একটি বিশাল চুক্তি করার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। এই চুক্তির নেপথ্যে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত এক বিচারকের স্ত্রী, যিনি তার পুলিশ সুপার (এসপি) পদমর্যাদার ভাইকে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ বা রাজশাহীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় পোস্টিং করাতে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সাথে এই বিপুল অঙ্কের চুক্তি করেন।

আইনি জটিলতা ও ঝুঁকি এড়াতে এই বিশাল লেনদেনের চুক্তিপত্রে ‘পোস্টিং’ শব্দের পরিবর্তে বিষয়টিকে ‘জমিসংক্রান্ত বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ করে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রের সাথে জড়িত হিসেবে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাহাদাত হোসেন খান, বরখাস্তকৃত পুলিশ কনস্টেবল মো. জুয়েল এবং মাসুম রানা নামের এক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। ঘটনার সাথে জড়িত অডিও রেকর্ড এবং চুক্তিপত্রের তথ্য এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

যেভাবে শুরু এই জালিয়াতি :

ঘটনার সূত্রপাত একটি জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে। রাজধানীর সাগুফতা এলাকায় ওই অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের স্ত্রীর আড়াই কাঠা জমি বেদখল হলে, তা উদ্ধারের জন্য তিনি কনস্টেবল জুয়েলের শরণাপন্ন হন। জমি উদ্ধারের অগ্রিম বাবদ জুয়েলকে প্রাথমিকভাবে ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে এককভাবে জমি উদ্ধারে ব্যর্থ হয়ে জুয়েল এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করেন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা শাহাদাত হোসেন খানকে, যাকে আরও ২০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এছাড়া জুয়েলের পরিচিত মাসুম নামের আরেক ব্যক্তিকে দেওয়া হয় ১০ লাখ টাকা। জমি উদ্ধারের নামে এভাবে মোট ৩৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নিলেও শেষ পর্যন্ত জমির কোনো সুরাহা হয়নি।

ভুক্তভোগী ওই নারী জানান, জমি উদ্ধারে ব্যর্থ হওয়ার পর চক্রটি তার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড জেনে নতুন ফাঁদ পাতে। তার স্বামী সাবেক জজ এবং পরিবারে সরকারি কর্মকর্তা আছে শুনে তারা প্রশাসনের উচ্চমহলে তদবিরের মাধ্যমে ডিসি বা এসপি পদে পোস্টিং করিয়ে দেওয়ার লোভনীয় প্রস্তাব দেয়। খোয়ানো টাকা তুলে আনার আশায় ওই নারীও এই ফাঁদে পা দেন এবং তার এসপি ভাইয়ের পদায়নের জন্য তদবির করতে রাজি হন।

১৫ কোটি টাকার চুক্তি ও ব্যাংকের চেক :

ভাইকে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ বা রাজশাহীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জোনে বদলি করার শর্তে ৪টি মূল দফায় ১৫ কোটি টাকার একটি লিখিত চুক্তিনামা তৈরি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, কাজ সম্পন্ন হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে চেকের মাধ্যমে পুরো অর্থ পরিশোধের কথা ছিল। কাজ না হলে চুক্তিপত্র ফেরত দেওয়ার শর্ত রাখা হয়।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, এই চুক্তির বিপরীতে ব্র্যাক ব্যাংকের ৬টি চেকে মোট ১৫ কোটি টাকার বিবরণী সংযুক্ত ছিল। এর মধ্যে ৫ কোটি টাকার একটি, ৩ কোটি টাকার একটি এবং ২ ও ১.৫ কোটি টাকার দুটি করে চেক ইস্যু করা হয়েছিল। এত বিপুল অঙ্কের টাকার উৎস সম্পর্কে ওই নারী জানান, চক্রটিই তাকে আশ্বস্ত করেছিল যে তারা নিজেরাই ‘ইনভেস্টর’ (বিনিয়োগকারী) খুঁজে বের করে টাকার ব্যবস্থা করবে।

প্রশাসনের শীর্ষ মহলের নামে হুমকি ও ‘মব’ আতঙ্ক :

পরবর্তীতে কাজ না হওয়ায় ওই নারী টাকা ফেরত চাইলে চক্রের পক্ষ থেকে তাকে তীব্র হুমকি দেওয়া শুরু হয়। চক্রের অন্যতম সদস্য শাহাদাত হোসেন হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে তাকে সতর্ক করে বলেন, প্রশাসনের শীর্ষ মহল এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাদের নখদর্পণে রয়েছে। বেশি নাড়াচাড়া করলে ওই নারীর পুলিশ কর্মকর্তা ভাইয়ের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।

একই সাথে চক্রটি নিজেদের ঢাকার এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর লোক বলে দাবি করে এবং ওই নারীর বাসায় ‘মব’ (উচ্ছৃঙ্খল জনতা) দিয়ে হামলা করানোর ভয় দেখিয়ে মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।

অভিযুক্তদের বক্তব্য ও দায় এড়ানোর চেষ্টা :

যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা শাহাদাত হোসেন খান সব অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তিনি কোনো বিচারক বা তার স্ত্রীকে চেনেন না এবং দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতার কারণে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কনস্টেবল জুয়েলের সাথে তার আর্থিক লেনদেন রয়েছে বলে দাবি করেন।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত কনস্টেবল মো. জুয়েল বদলি বাণিজ্যের সাথে সম্পৃক্ততার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন এবং একপর্যায়ে ফোন কেটে দেন।

চক্রের আরেক সদস্য মাসুম রানা জানান, জুয়েলের মাধ্যমে ওই নারীর সাথে তার পরিচয় হয়েছিল এবং তিনি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন, যা তিনি ফেরত দিতে চান কিন্তু ওই নারী যোগাযোগ বন্ধ রেখেছেন।

প্রেশনের উচ্চপর্যায়ের নাম ভাঙিয়ে বদলি ও পোস্টিংয়ের নামে এই বিশাল অঙ্কের আর্থিক চুক্তি এবং প্রতারণার ঘটনাটি বর্তমানে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

Share This