কৃষ্ণচূড়ার রঙিন আভাতেই ‘নায়কোচিত’ বিদায় আলী রেজা ইফতেখারের

কৃষ্ণচূড়ার রঙিন আভাতেই ‘নায়কোচিত’ বিদায় আলী রেজা ইফতেখারের

মো : শাহিদুন আলম April 16, 2026

সোনালী স্বপ্নের হাতছানি দিয়েই শুরু করেছিলেন পদযাত্রা। অবিরাম হেঁটেছেন উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত পথে। স্বপ্রতিভায় স্বমহিমায় বিকশিত হয়েছেন। দীর্ঘ যাত্রাপথে মিথ্যাকে রঙ মেখে নানাভাবে গোয়েবলসীয় কায়দায় এনে তাকে বিতর্কিত এবং জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির অপচেষ্টা হয়েছে গোপনে-প্রকাশ্যে।

সব চড়াই-উতরাই পার করেছেন! দু’হাতে ঠেকিয়েছেন অনেক ঘাত-প্রতিঘাত। সর্বাঙ্গ রুধির মেখে সব মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সত্য প্রতিষ্ঠায় ব্রত হয়েছিলেন। হ্যাঁ, নীতি এবং নৈতিকতার মানদণ্ডে আলী রেজা ইফতেখার যুগোত্তীর্ণ করেছেন নিজেকে। পরিশীলিত মেধা ও কুশলী-বিচক্ষণ নেতৃত্বের মাধ্যমে নিজের ২২ বছর সময়কেই আলোকোজ্জ্বল করেছেন বিদায়ী ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার।

কালস্রোতের ঊর্মিমালায় সৃষ্টিসুখের উল্লাসে সাফল্যে রাঙিয়েছেন ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কঠিন চ্যালেঞ্জিং অধ্যায়টিকে।

৪১ বছরের গৌরবময় সেই অধ্যায় এখন গোধূলি লগ্নে। আবেগ উথলে দেওয়া স্নায়ুকোষগুলো রেণু উড়িয়েছে দেশের সব ইস্টার্ন ব্যাংকের শাখাগুলোতে। আর মাত্র একদিন বাদেই থেমে যাচ্ছে তাঁর গৌরবোজ্জ্বল এক পথচলা। দাঁড়ি টানতে হচ্ছে নান্দনিক এক স্বপ্নযাত্রার।

ঠিক যেমন আলো বিলিয়ে দেওয়া সূর্যকেও এক সময় অস্ত যেতে হয় তেমনি কিংবদন্তিদেরও একসময় থামতে হয়, বলতে হয় ‘শুভ বিদায়’।

এভাবেই বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) থামছেন ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার। তবে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে বিউগলের করুণ সুরে নয়, কৃষ্ণচূড়ার রঙিন আভাতেই হতে যাচ্ছে তাঁর শেষ সূর্যাস্ত।

বলা হচ্ছে, এই ধরাধামে বিদায় বেলায় ক’জনেরই বা ভাগ্যে জোটে এমন নায়কোচিত সম্মান? কিন্তু বীরের সম্মাননার মতোই মহাকালের ইতিহাসে একজন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিজের বিদায় লিখে গেছেন স্বর্ণাক্ষরেই। স্বভাবতই বিদায় বেলায় তাঁর চোখের কোণে দু’এক ফোঁটা মণি-মুক্তো।

যদিও কেউ বলছেন না ‘আলী রেজা ইফতেখার বিদায়’। শুধুই বলছেন ‘লিজেন্ড’, ‘লিজেন্ড’, ‘গুডবাই’। চারিদিক থেকেই ভেসে আসছে গৌরবের এমন সব গর্জন। একটি সাচ্চা বাঘের জন্যই এই গর্জন। বিদায়বেলায় এটিই যেন আলী রেজা ইফতেখারের অনেক বড় এক অর্জন।

সাড়ে তিন যুগের এক মহাকাব্যের মধুর সমাপ্তি। এই মহাকাব্যের জন্যই হয়তো স্বপ্ন বুনেছিলেন একেকটি সূর্যোদয়, একেকটি গোধূলিতে মায়ের সঙ্গে কাটানো নিজের প্রতিটি মুহূর্তে।

এপ্রিলের কড়া রোদ্দুর আর ঘনিয়ে আসা বিষণ্নতায় জ্বলজ্বলে এক নক্ষত্রের ঐতিহাসিক বিদায়ক্ষণ। এরই মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হবে একটি রূপকথা।

ঠিক যেন শেষের কবিতার শেষ পাতা। যদিও এই দিনগুলোই বহু বছর পর ‘অশীতিপর’ একজন আলী রেজা ইফতেখারকে ভেজাবে সুখের বৃষ্টিতে। তিনি অবসরে গেলেও তাঁর নেতৃত্ব বেঁচে থাকবে যুগের পর যুগ সব সহকর্মী, সতীর্থ আর মানুষের ভালোবাসায়।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে যার নাম বাদ দিয়ে লেখা যায় না, তিনি আলী রেজা ইফতেখার। ২০০৭ সাল থেকে দীর্ঘ ১৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (ইবিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী হিসেবে তার পথচলা কেবল একটি পেশাদারী রেকর্ড নয়, বরং এটি একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করার এক মহাকাব্যিক রূপান্তর।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে কোনো পেশাদার ব্যাংকারের একক কোনো প্রতিষ্ঠানে এত দীর্ঘ সময় শীর্ষ পদে আসীন থাকার নজির বিরল। তার এই দীর্ঘমেয়াদী নেতৃত্ব প্রমাণ করে যে, সঠিক দূরদর্শিতা এবং নিষ্ঠা থাকলে একটি দেশীয় ব্যাংককেও আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ডে রূপান্তর করা সম্ভব।

সাফল্যের পরিসংখ্যান: ৪২ কোটি থেকে ৯০০ কোটির বিস্ময়কর উত্থান

আলী রেজা ইফতেখারের অধীনে ইবিএল-এর আর্থিক প্রবৃদ্ধি এক কথায় বিস্ময়কর। ২০০৭ সালে যখন তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন ব্যাংকের বার্ষিক মুনাফা ছিল মাত্র ৪২ কোটি টাকা এবং সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪,২৫৭.৯ কোটি টাকা। তার সুনিপুণ পরিচালনায় বর্তমানে ব্যাংকের বার্ষিক মুনাফা ৯০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আমানতের পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার কোটি টাকায় এবং ঋণের পোর্টফোলিও ২,৯০০ কোটি টাকা থেকে উন্নীত হয়েছে ৪৮ হাজার কোটি টাকায়। বর্তমানে ইবিএল-এর বার্ষিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমাণ ৭২০ কোটি ডলার, যা দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকটির বিশাল প্রভাবের স্বাক্ষর বহন করে।

ব্যাংকিংয়ের ‘ক্যানসার’ নির্মূলে ইফতেখার কৌশল

ইফতেখার মনে করেন, বর্তমান ব্যাংকিং খাতের প্রধান সংকট তারল্য নয়, বরং উচ্চ খেলাপি ঋণ—যাকে তিনি ‘ক্যানসারের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই ক্ষত ভিতর থেকে খাতটিকে ক্ষয় করে লভ্যাংশ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সংকট মোকাবিলায় তিনি ইবিএল-এ চারটি বিশেষ কৌশল প্রয়োগ করেছেন: সঠিক গ্রাহক নির্বাচন, ঋণ প্রস্তাবের নিখুঁত মূল্যায়ন, বিতরণের পর কঠোর মনিটরিং এবং শক্তিশালী আদায় ব্যবস্থা। এই শৃঙ্খলার কারণেই বিগত ৩০ বছরে ইবিএল-এর গড় খেলাপি ঋণের হার মাত্র ৩ শতাংশের কাছাকাছি রাখা সম্ভব হয়েছে।

নেতৃত্বের দর্শন: নৈতিকতা ও সুশাসনের সংমিশ্রণ

আলী রেজা ইফতেখার বরাবরই বিশ্বাস করেন যে, মুনাফা কোনো ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য হতে পারে না; বরং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী মূল্যবোধ থেকেই টেকসই মুনাফা আসে।

তার মতে, একটি কার্যকর ব্যাংকিং মডেলে পরিচালনা পর্ষদের কাজ নীতিনির্ধারণ করা, আর পেশাদার ম্যানেজমেন্ট সেই নীতির ভিত্তিতে কাজ করবে—এটাই তার সাফল্যের মূল মন্ত্র। স্টিভ জবস দ্বারা অনুপ্রাণিত এই নেতা সবসময় উদ্ভাবনে বিশ্বাস করেছেন। তার বিখ্যাত স্লোগান— “ইবিএল-এ আমরা চাকরি দিই না, ক্যারিয়ার গড়ি”—আজ দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি আদর্শ। ইবিএল থেকে তৈরি হওয়া দক্ষ ব্যাংকাররা আজ দেশের অন্তত ১৩টি ব্যাংকের শীর্ষ পদে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা তার মানবসম্পদ উন্নয়নের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি।

ডিজিটাল রূপান্তরের জাদুকর ও আধুনিক ব্যাংকিং

ডিজিটাল রূপান্তরের অগ্রপথিক হিসেবে তিনি ইবিএল-কে দেশের অন্যতম শক্তিশালী ডিজিটাল ব্র্যান্ডে পরিণত করেছেন। অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল প্ল্যাটফর্ম এবং ‘ক্যাশলেস সোসাইটি’ বিনির্মাণে তার উদ্ভাবনী চিন্তা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স ব্যাংকিং তাকে ‘দ্রুততম প্রবৃদ্ধিশীল ডিজিটাল ব্যাংক ২০২১’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে।

তিনি মনে করেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ এবং পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তির বিকল্প নেই। নতুন প্রজন্মের ব্যাংকারদের প্রতি তার স্পষ্ট বার্তা—শর্টকাটে কোনো সফলতা নেই; নেতৃত্ব দিতে হলে ধৈর্য, কঠোর পরিশ্রম এবং স্মার্ট চিন্তার সমন্বয় ঘটাতে হবে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও শিল্পের ওপর প্রভাব

আলী রেজা ইফতেখারের মুকুটে যুক্ত হয়েছে অসংখ্য দেশি-বিদেশি পালক। কোটলার ইমপ্যাক্ট কর্তৃক দেশের সর্বপ্রথম ‘সিইও অফ দ্য ইয়ার’ এবং এশিয়ান লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ডে ‘সিইও অফ দ্য ইয়ার ২০১২’ তার উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি। তার নেতৃত্বে ইবিএল টানা বহু বছর ‘ইউরোমানি’, ‘এশিয়ামানি’ এবং ‘দি এশিয়ান ব্যাংকার’ কর্তৃক বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ব্যাংকের মর্যাদা লাভ করেছে। দুই মেয়াদে অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার প্রাজ্ঞ পরামর্শ গোটা ইন্ডাস্ট্রিকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেছে।

কারও মতে এলিয়েন, কারও মতে সর্বকালের অন্যতম সেরা বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার। যার পান্ডুলিপিতে রাজকীয় চরিত্র সাফল্যের কথা কয়। তিনি একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালকই নন, সেরাদের মধ্যে অন্যতম। অগণিত সুখের প্রদীপ জ্বেলে তিনি আছেন ভাবনার করিডোরে। স্মৃতির পাতায় পাতায়, দৃষ্টির সীমানায়, হৃদয়ের আঙিনায়। অন্তহীন চাওয়ায় ছুটে চলা, ভেঙে সব বাঁধা, মহাকাব্য করে যান রচনা।

হাজার ফুলে ছেঁয়েছে যে পথ সে পথ যেন গিয়ে থামে তাঁর ঠিকানায়। যার মস্তিষ্কের কারুকার্যে ফুল ফুটেছে বাড়িতে বাড়িতে। অনাবিল সব সুখের ছোঁয়ায় তিনি উপহার দিয়েছেন এমনই সব স্বপ্নের দিন। সময় যেন থেমে রয় তাঁর জাদুর ছোঁয়ার আশায়। 

সম্ভবত এ কারণেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই মধুর গান দখল করেছে আলী রেজা ইফতেখার হৃদয়-মস্তিষ্ক ‘’মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে’।

বিদায়ের বিষাদ আছে সবারই মনে। বিষাদ ভুলে হাসিমুখে বিদায় জানিয়েছে সবাই তাকে। ‘যেতে নাহি দেব হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়’। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই পঙক্তিটি বারবার মনে করে আনমনে কেঁদে যাচ্ছে সবার হৃদয়।

আবার, কবিগুরুর শেষের কবিতার লাইনগুলোই কীনা গুঞ্জণ-গুঞ্জরিত হচ্ছে আলী রেজা ইফতেখারের কন্ঠে- হে ঐশ্বর্যবান/ তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারই দান/ গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়/ হে বন্ধু বিদায়।

আকাশে-বাতাসে অনাদিকালের সেই আকুল আকাঙ্খাও যেন ভেসে উঠছে। ‘তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না’। হৃদয়ের দশদিগন্তে এখন রঙিন আলোর নাচন। সে আলোয় দুলে উঠছে আত্মার গহিনে লুকানো ভালোবাসার কথা।

বিদায় মানে কি শুধু বিরহ? বিদায়ের অন্য অর্থ কি তবে বিচ্ছেদ? এজন্যই কী কবি বলে গেছেন-চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয়/ চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী/ চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে আমার না-থাকা জুড়ে।

কারও কারও মতে, বিদায় মানে কি প্রিয় মানুষটিকে চিরতরে হারিয়ে ফেলা? বিদায়ের ক্ষণটি সে জন্যই কি ব্যথাভরা? সে জন্যই কি বিদায়বেলায় কারো ‘সজল করুণ নয়ন’ নত হয়ে থাকে বেদনায়? কিন্তু সবাই যে চান হাসিমুখে বিদায় নিতে।

কারো চোখের পানিতে বিদায়ের পথটি ভিজে কর্দমাক্ত হয়ে উঠুক, তা যে আমরাও চাই না। সে জন্যই কি আকুতি আমাদের হৃদয়-মনে- ‘মোছ আঁখি, দুয়ার খোল, দাও বিদায়।’ সে জন্যই কি চোখে জল আর মুখে হাসি নিয়ে বলি- ‘শুভ বিদায়’। হ্যাঁ, আলী রেজা ইফতেখার , ‘শুভ বিদায়’ আপনাকে। কবিগুরুর ভাষায়- ‘তুমি রবে নীরবে.....

Share This