বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মানির রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লোটজ বলেছেন, বাংলাদেশ ও জার্মানির মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। জার্মানি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি গন্তব্য এবং ইউরোপে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার।
তৈরি পোশাক খাতের বাইরে প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গবেষণা ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বুধবার (২০ মে) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
ফ্রিডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুং (এফইএস) বাংলাদেশের সহযোগিতায় ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসাডর’ সিরিজের দ্বিতীয় অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)। আলোচনায় কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষার্থী, গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।
আলোচনায় বাংলাদেশ-জার্মানি সম্পর্ক, একাডেমিক সহযোগিতা, তরুণদের সম্পৃক্ততা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অতিথি, বক্তা ও আলোচকদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লোটজ, ফ্রিডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুং বাংলাদেশের রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. ফেলিক্স গ্রেডেস, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী এবং ফ্রিডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুং বাংলাদেশ-এর প্রোগ্রাম অ্যাডভাইজার সাধন কুমার দাস প্রমুখ।
ঢাকায় নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত বলেন, “আমরা এমন একটি বিশ্বে প্রবেশ করছি, যেখানে বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও জার্মানি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সংলাপভিত্তিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন সহযোগিতা ভবিষ্যতে সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।”
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আমি সত্যিই আনন্দিত। এই ক্যাম্পাস অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক ও প্রাণবন্ত। আজকের শিক্ষার্থীরাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে—কেউ কূটনীতিক হবে, কেউ নীতিনির্ধারক, কেউ গবেষক বা উন্নয়নকর্মী। তাই নিজেদের দক্ষতা, জ্ঞান ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।”
তিনি উল্লেখ করেন, “জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শ্রম অধিকার, দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং সুশাসনের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে জার্মানি বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় মানবিক সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।”
প্রশ্নোত্তর পর্বে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক জিল্লুর রহমান বাংলাদেশ-জার্মানি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন ও রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাষ্ট্রদূতের কাছে প্রশ্ন উত্থাপন করেন।
বাংলাদেশ-জার্মানি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লোটজ বলেন, “বাংলাদেশ ও জার্মানির সম্পর্ক আরও উন্নত হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন, জলবায়ু সহযোগিতা এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে জার্মানি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্প বৈচিত্র্যকরণ এবং দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বাড়তে পারে।”
উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জার্মান ভিসা প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “বর্তমানে জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদনকারীদের একটি বড় অপেক্ষমাণ তালিকা রয়েছে। প্রায় ৬০ হাজার আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং অনেক শিক্ষার্থী একাধিকবার আবেদন করছেন। প্রতিটি আবেদন ও নথিপত্র যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করতে হয়, কারণ অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া বা ভুল তথ্য ও নথি জমা দেওয়ার ঘটনাও দেখা যায়। ফলে অতিরিক্ত পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের প্রয়োজন হয়, যা সময়সাপেক্ষ।” তিনি আরও বলেন, “কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষার্থী ভিসা নিয়ে অনেকেই পড়াশোনার পরিবর্তে শ্রমবাজারে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আমাদের সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হয়। তবে অপেক্ষমাণ আবেদন কমে এলে ভবিষ্যতে ভিসা প্রক্রিয়া আরও দ্রুততর হবে বলে আমরা আশাবাদী। আমরা চাই আরও বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জার্মানিতে এসে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করুক।”
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, “জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এ সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসাডর’ সিরিজের এ আয়োজন কূটনীতি, শিক্ষা, তরুণ প্রজন্ম ও জ্ঞানবিনিময়কে একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে। এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক রাজনীতি, উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্পর্কে জানার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের তরুণ সমাজ মেধাবী ও সম্ভাবনাময়। জাতীয় উন্নয়নে এই শক্তিকে কাজে লাগাতে গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন ও বাস্তবমুখী শিক্ষার বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে জার্মানির শিক্ষা, প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।”
উপাচার্য আরও বলেন, “বাংলাদেশ ও জার্মানির মধ্যে বাণিজ্য, উচ্চশিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সুশাসন ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও স্কলারশিপ কর্মসূচির সঙ্গে অধিকতর একাডেমিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করে।”
তিনি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মনোযোগ দিয়ে আলোচনা শোনা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের সক্ষমতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
ফ্রিডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুং (এফইএস) বাংলাদেশ-এর রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. ফেলিক্স গ্রেডেস বলেন, “বাংলাদেশ ও জার্মানির মধ্যকার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে শিক্ষা, গবেষণা, যুবসম্পৃক্ততা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের আলোচনা অংশগ্রহণকারীদের জন্য একটি ফলপ্রসূ ও অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ অভিজ্ঞতা হবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি।”