ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই অর্থ পাচারের অভিযোগ এনে শতাধিক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির ব্যাংক হিসাব জব্দ, সম্পত্তি ক্রোক এবং বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না মিললেও তারা এখনো ভোগ করছেন হয়রানি ও আইনি জটিলতা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১১ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কথিত অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়। কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়াই তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয় এবং অনেকের সম্পত্তি ক্রোকের পাশাপাশি বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা ও তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নির্দেশনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এসব পদক্ষেপ নেয়।
এ সময় কথিত অর্থ পাচারের অভিযোগে বেসরকারি খাতের প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আহসান এইচ মনসুর অর্থ পাচারের নানা অভিযোগ তুলে বেসরকারি খাতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
তাদের দাবি, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশ সফর করা হলেও দেড় বছরে একটি টাকাও দেশে ফেরত আনা সম্ভব হয়নি। বরং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক পদক্ষেপে বিনিয়োগ পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অর্থ পাচারবিরোধী অভিযান জোরদারের অংশ হিসেবে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও দুদকের সমন্বয়ে একটি যৌথ তদন্ত দল গঠন করা হয়। তদন্ত সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিল বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নিরাপত্তাবেষ্টিত কক্ষে এসব তদন্তের নথি প্রস্তুত করা হয়।
তবে এক বছরেরও বেশি সময় তদন্তের পর ১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাঁচটির বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। এরপরও তাদের জব্দকৃত ব্যাংক হিসাব খুলে দেওয়া হয়নি কিংবা বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করা হয়নি।
শুধু এই পাঁচটি শিল্প পরিবারই নয়, প্রায় ৩০০ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশের বিরুদ্ধেই অভিযোগের সত্যতা মেলেনি। তবে তদন্ত নথিভুক্ত অবস্থায় থাকায় এবং কমিশনের অনুমোদন না থাকায় তারা এখনো মুক্তি পাননি।
এদিকে প্রায় তিন মাস ধরে দুদক কার্যত নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় রয়েছে। গত ৩ মার্চ দুদকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহ্সান ফরিদ পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে কমিশনবিহীন অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।
দুদক আইন অনুযায়ী, তদন্ত, চার্জশিট, মামলা অনুমোদনসহ সব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম কমিশনের অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়। কিন্তু কমিশনার না থাকায় নতুন মামলা, তদন্ত অনুমোদন কিংবা বিদেশযাত্রা নিষেধাজ্ঞার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। এতে একদিকে যেমন নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানও স্থবির হয়ে পড়েছে।
এ পরিস্থিতিকে নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, কমিশন না থাকায় দুদক তার মূল দায়িত্ব পালন করতে পারছে না এবং এটি সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
তিনি আরও বলেন, দুদক আইনে কমিশনার পদ শূন্য হলে ৩০ দিনের মধ্যে নিয়োগের বাধ্যবাধকতা থাকলেও দীর্ঘ সময়েও সরকার দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এর ফলে আইনি শূন্যতা তৈরি হয়েছে এবং অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে তদন্ত ও বিচার ছাড়াই সম্পদ জব্দ করার মতো ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, যা সংবিধানের মৌলিক চেতনার পরিপন্থি। পরে সংসদে অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারালে দুদক আইন-২০০৪ পুনরায় বহাল হয়।
বর্তমান আইনে নতুন কমিশন গঠনের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। এতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সদ্য বিদায়ী সচিব এবং সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান থাকার কথা। তবে এখনো সেই সার্চ কমিটি গঠন করা হয়নি।
সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, শিগগিরই সার্চ কমিটি গঠন করে নতুন কমিশন নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।