১৩০০ উন্নয়ন প্রকল্পের বোঝা বর্তমান সরকারের কাঁধে

১৩০০ উন্নয়ন প্রকল্পের বোঝা বর্তমান সরকারের কাঁধে

নিজস্ব প্রতিবেদক : June 25, 2026

বিগত সরকারের আমলে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অসমাপ্ত ১৩০০ উন্নয়ন প্রকল্পকে বর্তমান সরকারের জন্য বড় দায় হিসেবে দেখছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত ‘ডিবেটিং বাজেট অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এমন মন্তব্য করেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের নেওয়া ১৩০০ ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। এই প্রজেক্টগুলো আমাদের জন্য লায়াবিলিটি। কী ধরনের প্রজেক্ট আপনারা বুঝতে পারছেন। কিছু বাদ দিতে পারছি, সব বাদও দেওয়া যাচ্ছে না। অনেক প্রজেক্টের ৫০-৬০ পার্সেন্ট ইমপ্লিমেন্ট হয়ে গেছে। না ফেলতে পারছি, না গিলতে পারছি। এটা বর্তমান সরকারের বড় সমস্যা।

তিনি আরও বলেন, অবকাঠামো ও উন্নয়ন খাতের এই বিপুলসংখ্যক প্রকল্পের কাজ অর্ধেক বা তারও বেশি শেষ হয়ে যাওয়ায় এগুলো চাইলেও পুরোপুরি বাতিল করা সম্ভব হচ্ছে না। বিগত ১৫ বছরে নেওয়া এসব প্রকল্প আমাদের জন্য এখন বড় লায়াবিলিটি। এগুলো আসলে কোন ধরনের প্রকল্প, তা আপনারা নিশ্চয়ই খুব ভালো করেই বুঝতে পারছেন। আমরা এর মধ্য থেকে কিছু প্রকল্প বাদ দিতে পেরেছি, কিন্তু সব বাদ দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না।

আমির খসরু বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং স্পট বায়িং বা অর্থায়নের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। এর মাঝেই গতানুগতিক ফরম্যাট থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনীতিতে একটি নতুন মডেল ও চিন্তার ওরিয়েন্টেশন দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

বাজেটের মূল দর্শন তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের স্লোগানটাই ছিল— ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমি বা অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ। কারণ আমাদের অর্থনীতিটা বিগত বছরগুলোতে পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতিতে রূপ নিয়েছিল। শক্তিশালী ও সুসংগঠিত গোষ্ঠীগুলো সব সুবিধা পেলেও প্রান্তিক মানুষ ইকোনমিক প্ল্যানিংয়ের বাইরে থেকে গেছে। আমরা প্রান্তিক কামার-কুমার, কুটির শিল্প, তাঁতী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও গ্রামের নারীদের অর্থনৈতিক মূলধারায় আনতে চাই।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ বাড়াতে ফ্যামিলি কার্ড চালু গ্রামীণ চাহিদা ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, এর পাশাপাশি কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালুর ঘোষণা রয়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কৃষকদের পক্ষে শোধ করা সম্ভব হয় না। আমরা এসে দেখেছি ১০ হাজার কোটি টাকার কৃষি ঋণ মাফ করতে হয়েছে। তাই ঋণের বোঝা না চাপিয়ে সার ও বীজের মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে কৃষক কার্ড দেওয়া হচ্ছে। তবে রিসোর্স কনস্ট্রেইন্ট (সম্পদের সীমাবদ্ধতা) থাকার কারণে আমরা যতটুকু চেয়েছি ততটুকু করতে পারিনি।

অর্থমন্ত্রী জানান, সার্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা (ইউনিভার্সাল প্রিভেন্টিভ হেলথ কেয়ার) নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর ফলে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় বাড়বে। গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি, মৃৎশিল্প বা তাঁতশিল্পকে ব্র্যান্ডিং ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের (যেমন: অ্যামাজন, ইবে) সঙ্গে যুক্ত করে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি বা সৃজনশীল অর্থনীতির মাধ্যমে জিডিপিতে অবদান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশের মিউজিক, থিয়েটার ও ফিল্মকে বাণিজ্যিকভাবে সফল (মনিটাইজ) করতে পূর্বাচলে একটি থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও অত্যন্ত হতাশাজনক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকেও পাবলিক ফাইন্যান্সিং কমে আসছে। বড় ঋণের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে ক্যাপিটাল মার্কেট বা পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে। পুঁজিবাজারের জন্য আমরা সম্পূর্ণ পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়ে একটি নতুন কমিশন গঠন করেছি, যেখানে কোনো রাজনৈতিক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। আমরা অনেক আইন ও ট্যাক্স রিফর্ম করছি। এই সংস্কারের খবর পেয়ে ইতোমধ্যে জেপি মরগ্যানসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফান্ড ম্যানেজাররা বাংলাদেশে বিনিয়োগে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছেন, যা আমাদের ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমির স্বপ্ন পূরণে বড় ভূমিকা রাখবে।

বর্তমানে সরকারকে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ডেট বা ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এতে ফিসক্যাল স্পেস (আর্থিক সক্ষমতার জায়গা) সংকুচিত হয়ে এসেছে। তা সত্ত্বেও আগামীতে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির বড় লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের।

প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা আনতে প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের তদারকিতে এবার ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্ব-স্ব মন্ত্রীদের অফিস এবং আইএসে এই ড্যাশবোর্ড থাকবে। প্রতিদিন প্রতিটি প্রকল্পের মুভমেন্ট কী হচ্ছে, তা সরকার সরাসরি মনিটর করবে। কোথাও কাজের গতি থমকে গেলে বা ল্যাপস হলে সঙ্গে সঙ্গে ড্যাশবোর্ডে তা ফ্ল্যাশ করবে এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে এর জবাবদিহি করতে হবে।

বাজেটের শতভাগ না হলেও অন্তত ৮০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারলে দেশের প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন অর্থমন্ত্রী।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক।

সেমিনারটি সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ্। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সমিতির সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।

সেমিনারে প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন।

আলোচনায় আরও অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শারমিন্দ নীলোর্মি, বিআইডিএস-এর সিনিয়র গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মানবিক বিভাগের অর্থনীতি বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাজমুল ইসলাম।

Share This