সাবেক বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদের ৩য় মৃত্যুবার্ষিকী পালিত

সাবেক বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদের ৩য় মৃত্যুবার্ষিকী পালিত

নিজস্ব প্রতিবেদক : August 14, 2026

বীর মুক্তিযোদ্ধা, কিংবদন্তি ‘কিলো ফ্লাইট’ কমান্ডার ও সাবেক বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ, বীর উত্তম, এসিএসসি (অব.)-এর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী যথাযথ মর্যাদায় পালন করেছে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) এ উপলক্ষে বিমান বাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটি ও ইউনিটের মসজিদে বাদ জুমা তাঁর জীবন ও কর্মের ওপর আলোচনা করা হয়। পরে তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।

এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ ১৯৪৪ সালের ১ আগস্ট তৎকালীন নোয়াখালী, বর্তমান ফেনী জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম নূরুল হুদা এবং মাতা মরহুমা আনকুরেন্নেছা বেগম। তিনি ঢাকার আরমানিটোলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে পাকিস্তানের পিএএফ পাবলিক স্কুল, সারগোদা এবং পিএএফ একাডেমি, রিসালপুরে পড়াশোনা করেন। ১৯৭৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার স্টাফ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৬০ সালের ১৯ আগস্ট তিনি তৎকালীন পাকিস্তান বিমান বাহিনী একাডেমিতে যোগ দেন এবং ১৯৬২ সালের ১ জুলাই জিডি (পি) শাখায় কমিশন লাভ করেন। কর্মজীবনে তিনি একজন দক্ষ ও চৌকস বৈমানিক হিসেবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং দেশ-বিদেশে একাধিক পেশাগত প্রশিক্ষণ ও কোর্স সম্পন্ন করেন।

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান :

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশপ্রেমের অদম্য চেতনায় পাকিস্তান বিমান বাহিনী ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন তৎকালীন স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ। মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি ২ নম্বর সেক্টরের মাটিনগর ও মেলাঘর এলাকায় স্থলযুদ্ধে অংশ নেন। পরে ১ নম্বর সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

রামগড় থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তিনি একাধিক দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেন। চট্টগ্রামের মদুনাঘাটে বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন ধ্বংস করে ওই এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করার অভিযানও তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। স্থলযুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি শত্রুর গুলিতে ডান হাঁটুতে আহত হন।

সুস্থ হয়ে ১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ভারতের নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে নবগঠিত ‘কিলো ফ্লাইট’-এর অধিনায়কত্ব গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে পাইলট ইন কমান্ড হিসেবে অ্যালুয়েট-III হেলিকপ্টারে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল তেল ডিপোতে হামলা চালিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বিমান আক্রমণ অভিযানের সূচনা করেন। তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে ‘কিলো ফ্লাইট’ স্বল্প সময়ে মোট ৫০টি সফল বিমান অভিযান পরিচালনা করে। এর মধ্যে তিনি সরাসরি ২৫টি অভিযানে অংশ নেন।

মুক্তিযুদ্ধে স্থল ও আকাশ—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর সাহসী ভূমিকা ছিল অনন্য। দেশপ্রেম, বীরত্ব ও অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।

বিমান বাহিনী গঠনে অবদান :

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ। সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালের ২৩ জুলাই তিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৮৭ সালের ২৩ জুলাই বর্ণাঢ্য কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য ভূমিকা, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে সুসংগঠিত ও কার্যকর বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলায় অবদান এবং দেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০১৮’ প্রদান করে।

দীর্ঘ ৩৬ বছর ২২ দিন অবসর জীবনযাপনের পর ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর ১৪ দিন। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের জন্য তাঁর অসামান্য অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করা হয়।

Share This