অনলাইন জুয়া চক্রের ৫ সদস্য গ্রেপ্তার, বিপুল সিম ও চেকবই জব্দ

অনলাইন জুয়া চক্রের ৫ সদস্য গ্রেপ্তার, বিপুল সিম ও চেকবই জব্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক : August 13, 2026

অনলাইন বেটিং ও জুয়া পরিচালনাকারী সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ সময় তাদের কাছ থেকে নয়টি মোবাইল ফোন, ২০টি সিম কার্ড, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবইসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত জব্দ করা হয়েছে।

সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনস ইউনিটের একটি বিশেষ দল ১১ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—রায়পুরার শ্রীরামপুর এলাকার রফিকুল ইসলাম (৪৬), মনোহরদীর নোয়াদীয়া গ্রামের মো. সোহেল (৩৭), রসুলপুর এলাকার মো. শফিকুল ইসলাম (২৭), উত্তর নোয়াদীয়া এলাকার মো. রুবেল মোল্ল্যা (৩৩) এবং নরসিংদী সদরের নয়াদরাকান্দিয়া এলাকার আইয়ুব হোসেন রিপন (৪৮)।

সিআইডি জানায়, রায়পুরা থানার রেলগেট কলেজ মার্কেট এলাকা থেকে রফিকুল ইসলামকে, মনোহরদী থানার নোয়াদীয়া গ্রামের মৌলভী বাড়ি এলাকা থেকে সোহেলকে, মনোহরদী থানার সামনে রাজু টাওয়ার এলাকা থেকে শফিকুল ইসলাম ও রুবেল মোল্ল্যাকে এবং নয়াদরাকান্দিয়া এলাকা থেকে আইয়ুব হোসেন রিপনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, সাইবার মনিটরিংয়ের সময় সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার জানতে পারে, দেশের ভেতরে ও দেশের বাইরে অবস্থানকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নামে অনলাইন বেটিং ও জুয়ার ওয়েবসাইট পরিচালনা করে আসছে। এসব ওয়েবসাইটে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে অর্থের বিনিময়ে অনলাইন বেটিং ও জুয়ার আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব জুয়ার প্রচারণা ও বিজ্ঞাপন চালানো হচ্ছে।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে সিআইডি জানতে পারে, এসব সাইটে জুয়ায় অংশ নিতে ব্যবহারকারীদের প্রথমে টপ-আপ বা ডিপোজিট করতে হয়। এ জন্য বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়সহ বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ব্যাংক হিসাব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়। অর্থ জমা হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বেটিং অ্যাকাউন্টে সমপরিমাণ ই-মানি বা বট মানি যুক্ত করা হয়, যা পরে অনলাইন বেটিংয়ে ব্যবহার করা হয়।

সিআইডির তথ্যমতে, অর্থ জমা ও উত্তোলনের জন্য বিভিন্ন এমএফএস এজেন্ট নম্বর ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে চক্রটি। সময়ের সঙ্গে এসব নম্বর ও হিসাব পরিবর্তন করা হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে এমএফএস নম্বর ও ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করে তা টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে বেটিং সাইট পরিচালনাকারীদের কাছে সরবরাহ করা হতো।

প্রাথমিক তদন্তে আরও জানা গেছে, বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা অর্থ এজেন্টরা কমিশন রেখে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তরের পর দেশের বাইরে পাচার করত কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

এ ঘটনায় সিআইডির পক্ষ থেকে পল্টন মডেল থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলাটি ১৯ মে ২০২৬ তারিখে দায়ের করা হয়। এতে সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর ২০(২), ২১(২), ২৪(২) ও ২৭(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

সিআইডি বলছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অনলাইন বেটিং ও জুয়া পরিচালনাকারী চক্রের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। তাদের কাছ থেকে জব্দ করা মোবাইল ফোন, সিম কার্ড, ব্যাংক হিসাব ও চেকবইয়ের ফরেনসিক ও কারিগরি বিশ্লেষণ চলছে। এর মাধ্যমে চক্রের অন্যান্য সদস্য, আর্থিক লেনদেনের ধরন এবং অর্থের সম্ভাব্য গতিপথ শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে।

মামলাটির তদন্ত করছে সিআইডির সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনস ইউনিট। চক্রটির সঙ্গে দেশের বাইরে অবস্থানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না এবং অবৈধভাবে লেনদেন করা অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি বেটিং সাইট পরিচালনাকারী, এজেন্ট, অর্থ লেনদেনে ব্যবহৃত এমএফএস ও ব্যাংক হিসাবের মালিক এবং দেশি-বিদেশি সহযোগীদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

সিআইডি জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের PSD Circular No-07, dated 28 May 2025 অনুযায়ী অনলাইন জুয়া কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট চক্রগুলো বিভিন্ন কৌশলে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

অনলাইন জুয়া ও বেটিং থেকে বিরত থাকার জন্য দেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি। একই সঙ্গে অনলাইন বেটিং বা জুয়ার নামে কোনো ব্যক্তি বা চক্রের সঙ্গে অর্থ লেনদেন না করা এবং এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য পেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।

Share This