বিগত আওয়ামী লীগ সরকার শুধু দুর্নীতিই করেনি, দুর্নীতির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয়ও করেছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এবং নানা কারণে পিছিয়ে পড়া উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যেসব প্রকল্পে ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে, সেগুলো দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করা হবে। অন্যদিকে কম অগ্রগতি হওয়া প্রকল্পগুলো পুনর্বিবেচনা করে নতুন প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সচিবালয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা শেষে শেরে-বাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী এসব বলেন। এ সময় তিনি দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সার্বিক পরিস্থিতি, অতীতের অভিজ্ঞতা, বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেন।
জোনায়েদ সাকি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যে শুধুই দুর্নীতি হয়েছে তা নয়, দুর্নীতির পাশাপাশি অনেক অর্থের অপচয়ও হয়েছে। ফলে এখন শুধু নতুন প্রকল্প নেওয়াই নয়, পুরোনো প্রকল্পগুলো কী অবস্থায় আছে, সেগুলোর বাস্তব অগ্রগতি কতটুকু এবং জনগণের অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার হয়েছে, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চলমান প্রকল্পগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে পুনরুজ্জীবন করা হবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া হবে।
বর্তমান সরকার চলতি অর্থবছরের জন্য তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ঘোষণা করেছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অতীতের প্রকল্প বাস্তবায়নের হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের মতো পরিস্থিতি সেখানে সবসময় ছিল না। প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন হয়নি, ব্যয় বেড়েছে, সংশোধন হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সুফলও পাওয়া যায়নি। এ বাস্তবতায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় আগামী পাঁচ বছর মেয়াদি একটি উন্নয়ন কৌশলপত্র তৈরির কাজ করছে, যার আলোকে ভবিষ্যতের বাজেট, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালিত হবে।
জোনায়েদ সাকি বলেন, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা এখন পুনরুদ্ধার, পুনঃস্থাপন এবং পুনর্গঠনের তিন স্তরের কৌশলকে কেন্দ্র করে এগোচ্ছে। এই কৌশলগত কাঠামোর মধ্য দিয়ে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে আরও কার্যকর, বাস্তবসম্মত এবং জবাবদিহিমূলক করার চেষ্টা চলছে। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যেমন নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নও বড় একটি চ্যালেঞ্জ। সরকার এ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব শুধু প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া নয়। প্রকল্পগুলোর খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ, ব্যয়-সুবিধা মূল্যায়ন, বাস্তব অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং গুণগত মান যাচাইয়ের কাজও মন্ত্রণালয়ের আওতায় পড়ে। একই সঙ্গে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়ন বিভাগ প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি এবং অর্জন নিয়মিত পর্যালোচনা করে থাকে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গতি আনা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
দীর্ঘসূত্রিতা, অপচয় এবং অনিয়মের কারণ অনুসন্ধানে সরকার নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছেন। অতীতে যেসব প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে ছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রে কারা দায়ী, কেন ব্যয় বেড়েছে, কেন নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি এবং কোথায় কোথায় অপচয় বা ব্যর্থতা ঘটেছে, সেসব বিষয়ে তদন্ত করা হবে। দায়ীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
একটি প্রকল্পের উদাহরণ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোনো কোনো প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৯০ শতাংশের বেশি হলেও দীর্ঘ সময় ধরে সেগুলো সম্পন্ন হয়নি। এমন প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ করার অনুমোদন দেওয়া হলেও একইসঙ্গে সেসব প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রিতা ও ব্যয়ের কারণ অনুসন্ধানের কাজ চলবে। কারণ উন্নয়ন প্রকল্পে জনগণের অর্থ ব্যয় হয় এবং সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
চলমান প্রকল্পগুলোর বিষয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জোনায়েদ সাকি বলেন, বর্তমানে প্রকল্পগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যেসব প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৬০ শতাংশের বেশি, সেগুলোতে ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এসব প্রকল্পকে যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যাস করে যত দ্রুত সম্ভব শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে বিনিয়োগকৃত অর্থের সুফল জনগণ পেতে পারে।
অন্যদিকে যেসব প্রকল্পের অগ্রগতি ৬০ শতাংশের নিচে, বিশেষ করে ৩০ শতাংশেরও কম, সেগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এসব প্রকল্পকে পুনঃপরিকল্পনার মাধ্যমে অন্য প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বয় করা যায় কি না, অথবা নতুন কাঠামোয় বাস্তবায়ন করা যায় কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে নিয়মিত বৈঠক করছে বলেও জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ৬০ শতাংশের বেশি অগ্রগতি হওয়া প্রকল্পগুলো দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা হবে। আর যেসব প্রকল্পের কাজ ৩০ শতাংশের নিচে, সেগুলো পুনর্বিবেচনা করে নতুন প্রকল্পের সঙ্গে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে। এতে করে একদিকে যেমন অপচয় কমবে, অন্যদিকে উন্নয়ন কার্যক্রমও আরও বাস্তবমুখী হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা, অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত থাকবে, তাদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
এদিকে একনেক সভায় মোট সাত হাজার তিন কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচটি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘সাপোর্টিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্ট ফর চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ প্রকল্প। এছাড়া পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘ফেনী জেলাধীন মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (১ম পর্যায়)’ প্রকল্প, ‘করতোয়া নদী সিস্টেম উন্নয়ন’ প্রকল্প এবং ‘পদ্মা নদীর ভাঙন থেকে কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলাধীন তালবাড়িয়া এবং কুমারখালী উপজেলাধীন শিলাইদহ ইউনিয়নের কোমরকান্দি এলাকা রক্ষা (১ম সংশোধন)’ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। একইসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘১০০টি উপজেলায় ১টি করে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন (৩য় সংশোধিত)’ প্রকল্পও একনেকের অনুমোদন লাভ করেছে।