বাংলাদেশ পুলিশের মাঠপর্যায়ে কর্মরত সাধারণ সদস্যদের মধ্যে এখন চরম অসন্তোষ আর হতাশা বিরাজ করছে। দীর্ঘ ১৫-২০ বছর রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যারা পদোন্নতির স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাদের সেই স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ১৯৪৩ সালের ‘পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল’ (পিআরবি)-এর ৭১৪(বি) বিধি সংশোধনের নতুন উদ্যোগ। এই সংশোধনীর মাধ্যমে ৪ হাজার উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদে সরাসরি নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা মাঠপর্যায়ের সদস্যদের পদোন্নতির পথ কার্যত বন্ধ করে দিতে পারে।
বর্তমানে নিয়ম অনুযায়ী, এসআই পদের অর্ধেক পূরণ হয় সরাসরি নিয়োগে আর বাকি অর্ধেক আসে বিভাগীয় পদোন্নতির (কনস্টেবল থেকে এএসআই হয়ে) মাধ্যমে। কিন্তু নতুন এই প্রস্তাবে সরাসরি নিয়োগের সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়ায় মাঠপর্যায়ের প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কনস্টেবল, ১৫ হাজার নায়েক এবং ২৫ হাজার এএসআই-এর পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়বে।
মাঠের পুলিশ সদস্যদের দাবি, “আমরা যখন জীবন বাজি রেখে অপরাধী ধরি, তখন আমাদের অভিজ্ঞতাই প্রধান অস্ত্র হয়। আজ প্রযুক্তির দোহাই দিয়ে আমাদের ক্যারিয়ার ব্লক করে দেওয়া হচ্ছে। আমরা প্রযুক্তি শিখতে রাজি, কিন্তু আমাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করা কেন?”
পুলিশ সদর দপ্তর আধুনিকায়ন এবং সাইবার অপরাধ দমনের দোহাই দিলেও বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা মনে করেন, সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত তরুণদের যেমন মেধা আছে, তেমনি মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞ সদস্যদের রয়েছে গভীর জ্ঞান। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। এর আগে এএসআই পদে সরাসরি নিয়োগের ফলে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল, এসআই পদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একজন কনস্টেবল যখন চাকরিতে ঢোকেন, তখন তার স্বপ্ন থাকে একদিন কাঁধে তারা (স্টার) লাগাবেন। কিন্তু এই বিশাল সংখ্যক সরাসরি নিয়োগ মাঠপর্যায়ে একটি ‘ক্যারিয়ার ব্লক’ বা দীর্ঘস্থায়ী পদজট তৈরি করবে। ফলে বছরের পর বছর একই পদে পড়ে থেকে বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে চরম হতাশা ও কর্মস্পৃহা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, কেবল সরাসরি নিয়োগ বাড়িয়ে আধুনিকায়ন সম্ভব নয়। বরং মাঠপর্যায়ের যোগ্য সদস্যদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে তাদের পদোন্নতি নিশ্চিত করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
পিআরবি সংশোধনের মতো বড় সিদ্ধান্তে নীতিনির্ধারকদের উচিত মাঠপর্যায়ের হাজার হাজার সদস্যের ন্যায্য প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দেওয়া। বাহিনীর চেইন অফ কমান্ড এবং মনোবল বজায় রাখতে হলে বৈষম্যহীন পদোন্নতি ব্যবস্থার বিকল্প নেই।