পদোন্নতিতে বৈষম্য: মাঠ পর্যায়ে পুলিশের অসন্তোষ!

পদোন্নতিতে বৈষম্য: মাঠ পর্যায়ে পুলিশের অসন্তোষ!

নিজস্ব প্রতিবেদক : April 16, 2026

বাংলাদেশ পুলিশে ৪ হাজার উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদে সরাসরি নিয়োগের সাম্প্রতিক উদ্যোগ এবং এ লক্ষ্যে ১৯৪৩ সালের তৈরি 'পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল' (PRB)-এর ৭৪১(বি) বিধি সংশোধনের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে বাহিনীতে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনিক মহলে এটি একটি প্রয়োজনীয় সংস্কার হিসেবে দেখা দিলেও, এর প্রভাব নিয়ে মাঠপর্যায়ের বিশাল একটি অংশের মধ্যে চাপা উদ্বেগ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সংশোধনের নেপথ্যে প্রশাসনিক যুক্তি : 

পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাইবার অপরাধ দমন, ফরেনসিক তদন্তের মানোন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট পুলিশিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এই পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। উচ্চশিক্ষিত এবং প্রযুক্তি-দক্ষ তরুণদের সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে বাহিনীর তদন্ত কার্যক্রমে গুণগত আমূল পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

মাঠপর্যায়ের উদ্বেগ ও ক্যারিয়ারের অচলাবস্থা :

বিতর্কের মূল জায়গাটি হলো বর্তমান পদের বণ্টন কাঠামো। বর্তমানে বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, এসআই পদের মোট জনবলের প্রায় ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ এবং বাকি ৫০ শতাংশ কনস্টেবল থেকে এএসআই পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের সদস্যদের বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হয়।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি কনস্টেবল, ১৫ হাজার নায়েক এবং প্রায় ২৫ হাজার এএসআই কর্মরত রয়েছেন। এই বিশাল সংখ্যক সদস্যের কাছে এসআই পদে পদোন্নতি পাওয়া কেবল পেশাগত সাফল্য নয়, বরং ১৫-২০ বছরের নিরলস পরিশ্রমের চূড়ান্ত স্বীকৃতি।

অভিজ্ঞতা বনাম মেধা: ভারসাম্যের সংকট :

মাঠপর্যায়ের সদস্যদের দাবি, সাইবার অপরাধ দমনে প্রযুক্তিগত জ্ঞান প্রয়োজন সত্য, তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বছরের পর বছর অর্জিত বাস্তব অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় পর্যায়ের গোয়েন্দা দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। ইতোপূর্বে এএসআই পদে সরাসরি নিয়োগের সিদ্ধান্তের ফলে বাহিনীতে যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল, এসআই পদের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করলে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংহতি এবং কর্মস্পৃহা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি নিয়োগের হার বাড়িয়ে বিভাগীয় কোটা সংকুচিত করা হলে মাঠপর্যায়ে একটি 'ক্যারিয়ার ব্লক' বা দীর্ঘস্থায়ী পদজট তৈরি হতে পারে। এতে বাহিনীর প্রথম সারির যোদ্ধাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক, যা চূড়ান্তভাবে জননিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞ অভিমত ও সমাধানের পথ :

পুলিশের উচ্চপর্যায়ের সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, আধুনিকায়ন এবং অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি সুষম সমন্বয় (Balanced Approach) প্রয়োজন। সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে মেধাবীদের যেমন সুযোগ দিতে হবে, তেমনি মাঠপর্যায়ের যোগ্য ও দক্ষ সদস্যদের বিভাগীয় পদোন্নতির পথ রুদ্ধ করা সমীচীন হবে না। প্রয়োজনে পদোন্নতি প্রত্যাশীদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তির বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে তারাও সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের মতো সমান দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারেন।

একটি গতিশীল, পেশাদার ও বৈষম্যহীন পুলিশ বাহিনী গড়ার লক্ষে পিআরবি সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নীতিনির্ধারকদের উচিত মাঠপর্যায়ের সদস্যদের বাস্তবতা ও ন্যায্য প্রত্যাশার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা। বাহিনীতে শৃঙ্খলা ও মনোবল বজায় রাখার স্বার্থে এই সমন্বয়ই এখন সময়ের বড় দাবি।

Share This