লোভনীয় প্রস্তাব পেয়েও আপস করিনি: জামায়াত আমির

লোভনীয় প্রস্তাব পেয়েও আপস করিনি: জামায়াত আমির

নিজস্ব প্রতিবেদক : October 18, 2026

বহু লোভ দেখানো হলেও জামায়াতে ইসলামী সেগুলোর দিকে না তাকিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

 

রোববার (১৮ অক্টোবর) রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) উদ্যোগে ‘জুলাই সনদের ১ বছর: প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার সালতামামি’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

 

ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বিএনপি জনগণকে মূর্খ মনে করে এবং অবমূল্যায়ন করে। তারা নিজেদেরই শুধু জ্ঞানী মনে করে। তারা প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে হাত দিয়েছে। ছাত্ররা রাস্তায় নেমে এসেছিল মেধার অধিকার আদায় করার জন্য। মেধার ভিত্তিতে প্রত্যেকে নিজের যোগ্য স্থান নিশ্চিতের জন্য। তারা রাষ্ট্রকে সেবা দিতে চায়। আর এই সুযোগ তৈরি হয় পিএসসির মাধ্যমে। একের পর এক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার পর এখন তারা (বিএনপি) পিএসসিতে হাত দিয়েছে।

 

এখন রাজনৈতিক সরকারের প্রভাব খাটিয়ে পিএসসির সদস্যদের পদত্যাগ করতে বলা হচ্ছে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান সতর্ক করে বলেন, পিএসসি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এটি কোনো মন্ত্রীর পারিবারিক ব্যবসা নয়। কোনো মন্ত্রীর এ কথা বলার অধিকার নেই। চাকরির এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি এখন পুরোপুরি দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে পরিপূর্ণ করতে চায় তারা।

 

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা বলে, যে এলাকার মানুষ তাদের ভোট দেয়নি বা দেবে না, সেই এলাকায় কোনো বরাদ্দ দেওয়া হবে না। বর্তমান রাষ্ট্রপতিও রংপুরে একই কথা বলে এসেছেন। যে আবু সাঈদ বৈষম্যের বিরুদ্ধে বুক পেতে জীবন দিয়েছেন, তার এলাকায় গিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘ভোট দেবেন জামায়াতকে, জাতীয় পার্টিকে, আর উন্নয়ন চাইবেন বিএনপির কাছে-এটা কি বিএনপির বাবার তহবিল থেকে উন্নয়ন হবে?’

রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হওয়া করের টাকায় শিশু থেকে শুরু করে সব পেশা ও শ্রেণির মানুষের অবদান রয়েছে। কেউ প্রত্যক্ষ কর দেন, কেউ পরোক্ষ কর দেন। এটি একটি কমিউনিটি ফান্ড। গরিবের টাকা আলাদা করে রাখা হয় না। সব টাকা এক জায়গায় জমা হয়। সুতরাং, এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া শুধু অশালীনতা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় অপরাধ।

তিনি আরও বলেন, সরকারি দলের ২০০ জন সংসদ সদস্যের আসনে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, অথচ বিরোধী দলের একজন সংসদ সদস্যকেও সেই বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এই বৈষম্যের জন্যই কি এতগুলো জীবন গেল? এজন্যই কি আমাদের চব্বিশের জুলাই বিপ্লব হয়েছিল? চব্বিশের জুলাই বিপ্লব হয়েছিল পরিবর্তনের জন্য, বস্তাপচা রাজনীতির কবর রচনা করে নতুন রাজনীতির সূচনা করার জন্য। জনগণ এমনটাই আশা করেছিল। কিন্তু আবারও দেশটাকে সেই দিকেই টেনে নেওয়া হলো।

 

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সাত মাসেই রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে। আগের স্বৈরাচার যে পথে হেঁটেছিল, হুবহু সেই পথেই এ সরকার হাঁটছে। বিরোধী দল কি গালে আঙুল দিয়ে বসে থাকবে? শত ইঞ্জিনিয়ারিং ও চুরি-চামারির পরও জনগণ আমাদের যে কয়টি আসন দিয়েছে, সেই আসনগুলোর ৮৯ জন সংসদ সদস্য সারাদেশের ১৮ কোটি মানুষের পাহারাদার হিসেবে কাজ করবেন, ইনশাআল্লাহ।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা কথা দিচ্ছি, বিএনপি বদলে গেলেও আমরা আমাদের কথা বদলাবো না। জুলাই সনদ ও গণভোটের গণরায় আমরা আদায় করেই ছাড়বো, ইনশাআল্লাহ। আমাদের বহু লোভ দেখানো হয়েছে, কিন্তু আমরা সেগুলোর দিকে তাকাইনি; প্রত্যাখ্যান করেছি। যার ইচ্ছা, সে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করুক। কিন্তু হিমালয় পর্বতের মতো অটল থেকে লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাবে বিরোধী দল, ইনশাআল্লাহ।

 

আমাদের এই আন্দোলন কোনো দলের জন্য নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি দাবি জনগণের জন্য। জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য, ফ্যাসিবাদের পথ বন্ধ করার জন্য, বৈষম্যহীন সমাজকাঠামো গড়ে তোলার জন্য এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমাদের এই আন্দোলন। আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ মসৃণ ও বাসযোগ্য করার জন্যই আমাদের এই আন্দোলন। কোনো ধরনের চোখ রাঙানিকে আমরা পরোয়া করবো না।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা দেশকে ভালোবাসি। জ্বালাও-পোড়াও আমাদের আন্দোলনের কর্মসূচি নয়। আমাদের সন্তানেরা চব্বিশে দেখিয়ে দিয়েছে, জ্বালাও-পোড়াও লাগে না। খালি হাতে ঈমানি বল ও দেশপ্রেম বুকে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেলেই ফ্যাসিবাদের পতন হয়। এটি আমাদের জন্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা। এ পথ ধরেই আমরা এগিয়ে যাবো এবং নব্য ফ্যাসিবাদের পতন হবে, ইনশাআল্লাহ।

তিনি বলেন, আমরা তাদের (বিএনপির) পতন চাইনি; তাদের সফলতা চেয়েছিলাম। কারণ, তাদের সফলতা মানে দেশের সফলতা। আমরা ঘোষণা দিচ্ছি, ১৮ কোটি মানুষকে সহযোগিতা করবো। এই সরকার বিরোধী দলের সহযোগিতা নিতে ব্যর্থ। বিরোধী দলের সহযোগিতা নেওয়ার যোগ্যতা তাদের নেই।

 

 

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিলেও বাস্তবে সবার আগে বাংলাদেশ নয়; সবার আগে তারা নিজেরা, নিজেদের পরিবার, সন্তান, ভাগনে, ভাতিজা, শ্বশুর ও স্ত্রীকে রাখছে। আমরা সিন্ডিকেটের হাতে প্রিয় বাংলাদেশকে তুলে দেবো না। এ দিন শেষ। যুবকেরা জেগে উঠেছে। পূর্ণমুক্তি না আসা পর্যন্ত তারা ঘুমাবে না। আর আমরা যুবকদের সঙ্গে আরও শক্তিশালী হয়ে কাজ করবো, ইনশাআল্লাহ।

এবি পার্টির সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জুর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন ও বক্তব্য রাখেন এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম; বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক; এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি ও এবি পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ প্রমুখ।

Share This