ফেনীতে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ফসলি জমির মাটি যাচ্ছে শতাধিক ইটভাটায়

ফেনীতে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ফসলি জমির মাটি যাচ্ছে শতাধিক ইটভাটায়

ফেনী প্রতিনিধি : March 13, 2026

ফেনীতে কৃষি ভুমির ব্যবহার ও সুরক্ষা আইন ও পরিবেশ আইন অমান্য করে কৃষি জমির টপ সয়েল (উর্বর মাটি) কেটে প্রতিদিন সরবরাহ করা হচ্ছে জেলার শতাধিক ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে যেমন জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্যও। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় জেলায় বিলিন হবে কৃষি জমি। এর লাগাম এখনি টেনে না ধরলে মারাত্মক খাদ্য সংকটে পড়বে দেশ। মাটিদস্যুরা এতটাই আগ্রাসী যে হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেনা সরকারী জায়গা,নদী এবং কি খালের পাড়ও। সন্ধ্যা হতেই চলাচল শুরু হয় মাটি দস্যুদের তৎপরতা।

 

প্রতিদিনই মাটিভর্তি কয়েকশত ট্রাক ও পিকআপ নেমে পড়ে মাটি পরিবহনে। মাটিবাহী ট্রাকের প্রভাব পড়ছে সড়ক গুলোতে ও। এসব মাটি দস্যুরা সিন্ডিকেট করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। রাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে জরিমানা আদায়, এক্সকাভেটর ও ট্রাক্টর জব্দ করেও থামানো যাচ্ছে না মাটিখেকোদের কালো থাবা। মাটি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। উপজেলার খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফেনী সদর উপজেলার বিরলী, ভগবানপুর, শর্শদী, বালিগাঁও, ছনুয়া, মোটরী কাজিরবাগ, দাগনভূঞা উপজেলার রাজাপুর, জায়লস্কর, সিন্দুরপুর, রামনগর, এয়াকুবপুর, মাতৃভূঞাসহ ফুলগাজী, পরশুরাম ও সোনাগাজী উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষিজমিগুলো থেকে রাতের আঁধারে কাটা হচ্ছে ফসলি জমির মাটি। বছর দশেক ধরে চলছে এ ধরনের মাটিকাটা। এর ফলে ফেনীর কৃষি জমি বিনষ্ট হচ্ছে।

 

ফেনী সদরের বিরলী ও রতনপুরে বিগত ক্ষমতাসীনদের সাথে আতাত করে দেড় যুগ ধরে চলছে টানা মাটি কাটা। এসব মাটি দস্যুরা সম্পতি বিরলী ও ভগবান- পুরের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত করের চড়া খালের পাড় কেটে নিয়ে গেছে। এবংকি মাটি পরিবহনের জন্য খালের পাড় ও বন বিভাগের গাছ গেটে ডাইভারসন তৈরি করে। পরে খবর পেয়ে অভিযান চালায় সহকারী কমিশনার (ভূমি)। রবিবার অভিযান তিনি অভিযান চালিয়ে কাইকে না পেলেও ৩টি এক্সেভেটর জব্দ করেন। এসময় তিনি অভিযুক্তদেও বিরুদ্ধে মামলা করার ঘোষনা দেন।

 

অপরদিকে উত্তর কাশিমপুর গ্রামে ফসলি জমি থেকে প্রতিদিনই মাটি লুট করা হচ্ছে। মাটি ব্যবসায়ীরা ভেকু (এক্সেভেটর) দিয়ে কোথাও ২০ থেকে ৩০ ফুট গভীর গর্ত করে মাটি নিয়ে যাচ্ছে। এসব গর্তে পাশের কৃষিজমির মাটিও ভেঙে পড়ছে। কোনো কোনো জমির মালিক টাকার লোভে মাটি বিক্রি করলেও অধিকাংশ কৃষক বাধ্য হয়ে মাটি বিক্রি করছেন। মাটি ব্যবসায়ীদের লুট থেকে বাদ যাচ্ছে না খাসজমি, খাল ও নদ-নদীর তীর। এসব মাটির শেষ ঠিকানা হচ্ছে ইটভাটা। গভীর গর্ত করে মাটি কেটে নেওয়ায় এরই মধ্যে শতাধিক একর কৃষিজমি জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। জমিগুলোয় বোরো ধান আর সরিষা চাষ করা হতো। গভীর গর্ত করে মাটি কাটায় ওই সব জমিতে দিন জমিতে দিন দিন কমে যাচ্ছে ফসল উৎপাদন। পরিবেশ ও প্রতিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

 

কৃষিজমি থেকে মাটি কেটে নেওয়ার বিষয়টি শিকার করে এক মাটি ব্যবসায়ী বলেন, 'যারা মাটি বিক্রি করছেন, তারা জেনেশুনেই বিক্রি করছেন। আর আমরা কিনে নিয়ে আশপাশের ইটভাটা মালিকদের কাছে বিক্রি করছি। এই এলাকার মাটি ইটভাটার জন্য খুবই উপযোগী। জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বিগত এক মাসে জেলার বিভিন্ন স্থানে রাতের বেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে ফসলি জমির উর্বর মাটি কাটার বিরুদ্ধে ২৯টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মাটিখেকোদের বিরুদ্ধে ২৭টি মামলা করে। এসব মামলায় ২১ লাখ ২০ হাজার টাকা অর্থদন্ড ও ৭ জনকে কারাদন্ডে পাশাপাশি জব্দ করা হয় মাটি কাটার বিভিন্ন উপকরণ। কিন্তু এসব অভিযান চালিয়েও রক্ষা করা যাচ্ছে না ফসলি জমির উর্বর মাটি। ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়ার ডমুরুয়া এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহিম বলেন, কাটাখালী ব্রিজের পাশে নদীপারের এলাকা থেকে বিএনপি নেতা মোজাম্মেল হকসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। ধ্বংস করা হচ্ছে কৃষিজমি। এ ছাড়া পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে মাটি কেটে নিয়ে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা।

 

ভগবানপুর গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ভগবানপুর-লক্ষ্মীয়ারা দেড় কিলোমিটার সড়কটি প্রায় ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ে পাকা করা হয়েছে। রাতের আঁধারে মাটির গাড়ি চলাচল করে রাস্তাটি কাজ শেষ হওয়ার মাসখানেকের মধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে।তিনি জানান, বিরলীতে কামাল মজুমদার ও আমাদের এখানে মুরাদ, মারুপ, সুফল, কাউসার ও মামুন মাটি ব্যবসা করছে। তারা নিয়মিত ফসলী জমির মাটি নিয়ে যাচ্ছে। 

 

ফেনী উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবু তৈয়ব বলেন, 'ফসলি জমির উপরিভাগের ১০ থেকে ১২ ইঞ্চির মধ্যে মাটির জৈব উপাদান থাকে। সেই মাটি কাটার ফলে জমির জৈব উপাদান চলে যায়। এতে জমির স্থায়ী ক্ষতি হয়। ফসলি জমির মাটি কাটা তাই বেআইনি। জেলা 

 

বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল জানান, ফসলি জমির উর্বরতা মাটি রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, মাটির বিক্রেতা-ক্রেতা এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

 

মাটিকাটা প্রসঙ্গে ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু বলেন, 'আমার আসনে মাটি কাটা বন্ধ করা হবে। 

 

জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ফসলি জমির টপসয়েল বিক্রি করা আইনগতভাবে অপরাধ। এসব মাটি বিক্রি বন্ধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ অভিযান চলমান রয়েছে। ফসলি জমির মাটির ক্ষেত্রে ক্রেতা- বিক্রেতা উভয়ই সমান অপরাধী। তাই এ বিষয়ে কোনো পক্ষকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

Share This