ই-টিন আছে, অথচ আয়কর রিটার্ন জমা দেননি? তাহলে কি আপনাকে গুনতে হবে ৫ হাজার টাকা জরিমানা? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন তথ্য নিয়ে অনেকের মধ্যেই তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। তবে বাস্তবতা হলো, শুধু ই-টিন থাকলেই সবার ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৫ হাজার টাকা জরিমানা আরোপ করা হয় না। রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে জরিমানার পরিমাণ নির্ধারিত হয় আয়কর আইন ও করদাতার পরিস্থিতি বিবেচনায়।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারা অনুযায়ী, যেসব করদাতার আগে কখনো আয় নিরূপণ করা হয়নি, তাঁদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জরিমানা ৫ হাজার টাকা হতে পারে। আর আগে আয় নিরূপণ হয়ে থাকলে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর প্রদেয় করের ৫০ শতাংশ অথবা ১ হাজার টাকা—দুটির মধ্যে যেটি বেশি, সেই অনুযায়ী জরিমানা নির্ধারণের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া ন্যূনতম ১ হাজার টাকা জরিমানা এবং রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫০ টাকা জরিমানার বিধানও রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা কত?
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, নতুন আয়কর কাঠামোয় বিভিন্ন শ্রেণির করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে—
- সাধারণ পুরুষ করদাতা: ৪ লাখ টাকা।
- নারী ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব প্রবীণ নাগরিক: ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
- প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা: ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
- গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাইযোদ্ধা: ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
সাধারণ করদাতাদের জন্য প্রস্তাবিত কর স্ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত। পরবর্তী ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, এর পরবর্তী ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ এবং পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ২৫ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য। অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ করের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রদত্ত তথ্যে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা ছিল ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। নতুন কাঠামোয় তা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। তবে এসব পরিবর্তনের চূড়ান্ত প্রযোজ্যতা নিশ্চিত করতে সরকারি প্রজ্ঞাপন ও এনবিআরের নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।
কারা রিটার্ন না দিলে জরিমানার মুখে পড়তে পারেন?
শুধু ই-টিন থাকাই রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নির্ধারণের একমাত্র শর্ত নয়। বার্ষিক আয়, পেশা, আর্থিক কার্যক্রম এবং নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে রিটার্ন জমার প্রমাণপত্রের প্রয়োজনীয়তার ওপরও বিষয়টি নির্ভর করে।
সাধারণত যাঁদের রিটার্ন জমা দিতে হয়, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—
যাঁদের বার্ষিক আয় নির্ধারিত করমুক্ত সীমা অতিক্রম করে।
ফার্মের অংশীদার এবং কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী।
সরকারি চাকরিজীবীসহ আইন দ্বারা নির্ধারিত বিভিন্ন শ্রেণির ব্যক্তি।
ব্যাংকঋণ বা ক্রেডিট কার্ড নেওয়া, জমি বা সম্পত্তি নিবন্ধনসহ নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণে যাঁদের রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র প্রয়োজন হয়।
আয় নেই, তবু ই-টিন আছে? কী করবেন
অনেকে চাকরি, ব্যবসা বা অন্য প্রয়োজনে ই-টিন নিয়েছেন। পরে আয় বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা আয় করযোগ্য সীমার নিচে নেমে এসেছে। কিন্তু আয় না থাকলেই বা কর দিতে না হলেই রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে যায় না।
এ ক্ষেত্রে প্রথমে দেখতে হবে, আইন অনুযায়ী আপনার রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক কি না। প্রয়োজন হলে প্রযোজ্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে টিআইএন বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর অফিসে আবেদন করা যেতে পারে। তবে আবেদন করলেই টিআইএন বাতিল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই; কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন।
নিজের বকেয়া রিটার্ন বা করসংক্রান্ত অবস্থা জানতে এনবিআরের ই-রিটার্ন পোর্টাল etaxnbr.gov.bd-এ লগইন করে তথ্য যাচাই করতে পারেন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল অফিসের পরামর্শ নেওয়াও ভালো।
আতঙ্কিত হওয়ার আগে যা যাচাই করবেন
ই-টিন আছে, রিটার্ন জমা দেননি—এমন পরিস্থিতিতে সবার জন্য একই অঙ্কের জরিমানা প্রযোজ্য নয়। আপনার রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক কি না, আগে আয় নিরূপণ হয়েছে কি না এবং আইন অনুযায়ী কোন জরিমানার বিধান প্রযোজ্য—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে আতঙ্কিত না হয়ে নিজের করসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করুন। তবে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হলে তা উপেক্ষা না করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই ভালো।