কৃষি খাতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বাস্তবায়নে আরও বেশি বিনিয়োগ ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী।
তিনি বলেন, কৃষির রূপান্তরের লক্ষ্য শুধু ঘোষণা করলেই হবে না, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি ব্যাহত হতে পারে। এ সময় বাজেট বরাদ্দ বাড়লেও তা মূল্যস্ফীতি সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মন্তব্য করেন।
সোমবার (২৯ জুন) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে এগ্রিকালচারিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এ্যাব) আয়োজিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭: কৃষি উন্নয়নের রূপরেখা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা থেকে কিছুটা বেশি। তবে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নিলে প্রকৃত অর্থে এ খাতে বরাদ্দের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়নি।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। জাতীয় বাজেটের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও সেই তুলনায় কৃষি খাতে বরাদ্দ প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। কৃষির উন্নয়নে সরকারের ভিশন বাস্তবায়নে আরও পরিকল্পিত বিনিয়োগ প্রয়োজন।
রিজভী বলেন, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পর গ্রামীণ কৃষিঋণ কর্মসূচি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, খাল খনন এবং কৃষির যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে ঘুরে দাঁড়ায়। কৃষি ব্যাংক ও রাকাবের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি এসব উদ্যোগের সুফল কাছ থেকে দেখেছেন বলেও উল্লেখ করেন।
কৃষিপণ্য রফতানির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে শিল্প উপদেষ্টা বলেন, সম্প্রতি ভিয়েতনাম সফরে গিয়ে তিনি জেনেছেন, দেশটি বাংলাদেশ থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন আলু আমদানি করছে এবং ভবিষ্যতে এক লাখ মেট্রিক টন পর্যন্ত আমদানিতে আগ্রহী। উদ্বৃত্ত কৃষিপণ্যের জন্য আগেভাগেই আন্তর্জাতিক বাজার নিশ্চিত করা গেলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং রফতানি আয়ও বাড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংরক্ষণ প্রযুক্তির ঘাটতির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন রুহুল কবীর রিজভী। বলেন, আম ও আলুর মতো কিছু পণ্য সংরক্ষণ করা গেলেও পেঁয়াজ, আদা ও রসুন দীর্ঘদিন সংরক্ষণের কার্যকর প্রযুক্তি দেশে এখনো গড়ে ওঠেনি। উন্নত দেশগুলোর আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি দ্রুত দেশে আনার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে আদা ও রসুনের উৎপাদন বাড়ছে। এসব পণ্যের উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
কৃষি দুর্বল হয়ে পড়লে খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতি—সবকিছুই নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে। মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার সরকারি লক্ষ্য অর্জনে কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খাতে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর শিল্প উপদেষ্টা।
সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে এগ্রিকালচারিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ড. কামরুজ্জামান কায়সার বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ট্যাক্স-টু-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কম, যা বর্তমানে প্রায় ৭ শতাংশ। কৃষিকে শিল্পে রূপান্তর করা গেলে এ অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
তিনি বলেন, কৃষকদের আরও মাঠমুখী করা, অপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য আমদানি কমানো এবং পেঁয়াজ, রসুন, আদা, আলুসহ দেশীয় কৃষিপণ্যের সংরক্ষণে ১ থেকে ২ হাজার আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন জরুরি।
একই সঙ্গে ২০০৮ সালের কৃষিনীতি বর্তমান বাস্তবতার আলোকে হালনাগাদেরও আহ্বান জানান তিনি।