সরকার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো সারা দেশের সাংগঠনিক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার (৯ মে) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে সব সাংগঠনিক ইউনিটের সঙ্গে দিনব্যাপী বিশেষ এই মতবিনিময় সভা হবে।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, মতবিনিময় সভায় মূলত সরকারি ও বিরোধী দলের রাজনীতির পার্থক্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বার্তা তুলে ধরবেন তিনি। একই সঙ্গে সরকার ও দলের মধ্যকার কাজের পার্থক্যও তুলে ধরবেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ১৭ বছর বিএনপির রাজনীতি মানেই ছিল রাজপথমুখী। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই রাজনীতির ধারায় পরিবর্তন এসেছে। তাই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের কথা জনগণের সামনে তুলে ধরতে নির্দেশনা দেওয়া হবে আজকের বিশেষ বৈঠকে। সরকারি দল হিসেবে নেতা-কর্মীদের করণীয়, জনগণের সুশাসন নিশ্চিত করতে আগামীতে তাদের কী ধরনের ভূমিকা থাকা প্রয়োজন তা তুলে ধরা হবে মতবিনিময় সভা থেকে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু খবরের কাগজকে বলেন, ‘মতবিনিময় সভায় নানা দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে আমাকে আমার মন্ত্রণালয় সম্পর্কে কাজের বিস্তারিত তুলে ধরতে বলা হয়েছে।’
সূত্র আরও জানায়, জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত ও সঠিক বার্তা পৌঁছে দিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের বিবরণ তুলে ধরে ব্রিফিং করবেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। আগামী দিনে সরকার ও দলের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে করণীয়, সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণ, সংগঠন নিয়মনীতি নেতা-কর্মীদের মেনে চলার নানা দিকনির্দেশনা থাকবে–এই মতবিনিময় সভার মূল এজেন্ডা। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি সুসংহত রাখতে দেওয়া হবে নানা পরামর্শ। মূল দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সামনে রেখে সভায় দেওয়া হবে নানা দিকনির্দেশনা। একই সঙ্গে সারা দেশের সাংগঠনিক ইউনিটকে গতিশীল করতে তৃণমূলের মতামত শুনবেন তারেক রহমান।
বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, মতবিনিময় সভা থেকে জুলাই সনদ নিয়ে বিরোধী দলের কর্মসূচি ও তাদের মিথ্যা গুজবের বিষয়ে নেতা-কর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে। জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির প্রকৃত অবস্থান জনগণের মাঝে সঠিক তথ্য উপস্থাপনের জন্য দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ সরকার শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারের এসব পদক্ষেপ জনগণের মাঝে তুলে ধরতে কিছু কর্মসূচি পালনের বিষয়ে নেতাদের নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে।
মতবিনিময় সভায় বিএনপি এবং অঙ্গসহযোগী সংগঠন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের সারা দেশের জেলা ও মহানগরের শীর্ষ দুই নেতা অংশ নেবেন। আর কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ পাঁচ নেতা অংশ নেবেন। এ ছাড়া বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও অঙ্গসংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক উপস্থিত থাকবেন। ইতোমধ্যে নয়াপল্টন পার্টি অফিস থেকে আমন্ত্রিত অতিথিদের আইডি কার্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গতকাল বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী গতকাল অনুষ্ঠানস্থল রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তন পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সাংগঠনিক তৎপরতার অংশ হিসেবে এই মতবিনিময় সভা। সারা দেশের জেলা পর্যায়ের নেতারা সভায় তাদের মতামত তুলে ধরবেন। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতারা সাংগঠনিক বিষয় এবং সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরবেন। পাশাপাশি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত তিন মাসে যেসব কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং যেগুলো বাস্তবায়নের পথে রয়েছে সেসব বিষয়ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা বিশ্লেষণসহ উপস্থাপন করবেন।
তিনি বলেন, বিরোধী দল বিভিন্ন সমালোচনা করতেই পারে। তবে সমালোচনাটা যেন গঠনমূলক হয়। সরকারের ভুল থাকলে সেই ভুলগুলো দেখিয়ে দিলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। রাষ্ট্র আরও কার্যকর ও কর্মক্ষম হয়। শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য বিরোধী দলের সমালোচনা জরুরি।
রিজভী বলেন, জনগণ যদি মনে করে বিরোধী দলের কথা ইতিবাচক, তাহলে জনগণই মূল্যায়ন করবে। আগামী নির্বাচনে জনগণই বিবেচনা করবে সরকার সঠিক কাজ করেছে কি না? তবে বিরোধী দল যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবে সরকারকে বিপদে ফেলার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেয় এবং মিথ্যা তথ্য ছড়ায়, তাহলে সেটা ষড়যন্ত্র। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থেকে এবং ক্ষমতার বাইরেও অনেক মিথ্যা কথা বলেছেন। যদি সেই ধরনের রাজনীতি হয়, তাহলে সেটা ষড়যন্ত্র।
স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘তিন মাসের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও আগামী দিনের সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরতে এই মতবিনিময়। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনামূলক মতবিনিময় সভায় স্বেচ্ছাসেবক দলের জেলা ও মহানগর ইউনিটের শীর্ষ দুই নেতা উপস্থিত থাকবেন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুবদলের এক সিনিয়র নেতা বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান মতবিনিময় সভায় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেবেন। সেখানে আমরা কথা বলার সুযোগ পাব কি না, তা বুঝতে পারছি না। কী ধরনের প্রোগ্রাম হবে– এটাও অনেকে আন্দাজ করতে পারছেন না। শুধু সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা কথা বলার সুযোগ পেতে পারেন। দলকে আরও সক্রিয় করতে জেলার নেতারা তাদের মতামত তুলে ধরতে পারেন।’
বিএনপি সূত্র জানায়, সরকার গঠনের পর নেতারা সার্বক্ষণিকভাবে যার যার মন্ত্রণালয়ের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। প্রতিমন্ত্রী-এমপিদের মধ্যে কয়েকজন নেতা রয়েছেন, যারা বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতাও। তারা সরকারি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় যার যার সংগঠনে সময় দিতে পারছেন না। এর পরিপ্রেক্ষিতে দলের ভেতর থেকে তাগিদ ওঠে সরকারের পাশাপাশি দলকে সক্রিয় করার। এক নেতার এক পদ– নীতিতে চলার পরামর্শ দেন কেউ কেউ। অনেকে বলছেন, বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি।