দেশ কাঁপানো সিসা চালান: দুই সহোদরকে ঘিরে চাঞ্চল্য

দেশ কাঁপানো সিসা চালান: দুই সহোদরকে ঘিরে চাঞ্চল্য

নিজস্ব প্রতিবেদক : July 03, 2026

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সিসার চালান জব্দ করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। এ ঘটনায় একটি মাদক কারবারি চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন আহমেদ শরীফি (৩৪), মেহদাদ শরীফি (৩৪) ও মো. মাকসুদ আলম (৪০)। আহমেদ ও মেহদাদ ইরানি বংশোদ্ভূত। তাদের মধ্যে দুই সহোদর ইরান থেকে সিসা বিক্রির কার্যক্রম শিখে এসে বাংলাদেশে অনলাইনে এই অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করতেন।

শুক্রবার (৩ জুলাই) সেগুনবাগিচায় ডিএনসির প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দীন।

তিনি বলেন, রাজধানীর গুলশান ও ভাটারা এলাকায় সমন্বিত বিশেষ অভিযান চালিয়ে দেশের ইতিহাসে সর্বাধিক পরিমাণ সিসা উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে একটি আন্তজেলা অনলাইন মাদক সরবরাহকারী চক্রের মূলহোতা দুই সহোদরসহ মোট তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ৬৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা, ৪১টি হুক্কা, ৪০ কেজি সিসা সেবনের কয়লা, পাঁচটি মোবাইল ফোন এবং বিপুল পরিমাণ সিসা সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায় আহমেদ শরীফি ও মেহদাদ শরীফির নেতৃত্বে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনার মাধ্যমে ঢাকাসহ সারা দেশে অনলাইনে অবৈধ সিসা ও সিসা সেবনের উপকরণ বিক্রি ও সরবরাহ করছে। ওই পেজের মাধ্যমে অর্ডার করা দুটি সিসার চালান দেশীয় কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে পাঠানো হবে বলে তথ্য পাওয়া যায়।

ওই তথ্যের ভিত্তিতে ডিএনসির একটি বিশেষ অভিযানিক দল গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকায় প্রথম অভিযান চালায়। সেখান থেকে ওই ফেসবুক পেজের নামে পাঠানো এক কেজি সিসাসহ একটি পার্সেল জব্দ করা হয়। পরে একই দিন মালিবাগ এলাকা থেকে একই পেজের নামে পাঠানো আরও এক কেজি সিসাসহ দ্বিতীয় পার্সেলটি জব্দ করা হয়।

ডিএনসির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, জব্দ করা দুটি পার্সেলের প্রেরকের ঠিকানা যাচাই করে একই দিন গুলশানের কালাচাঁদপুরের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে অভিযুক্ত দুই সহোদরকে ভাড়া বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ওই ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে আরও ৪৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা এবং ২০টি হুক্কা উদ্ধার করা হয়।

গ্রেফতারকৃত দুই সহোদর জানান, তাদের সরবরাহ করা সিসার একটি বড় অংশ আসতো মো. মাকসুদ আলম নামে আরেক ব্যক্তির কাছ থেকে, যিনি ভাটারা থানাধীন নূরেরচালা এলাকায় বসবাস করেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে ওই দিন রাতেই অভিযানিক দলটি নূরেরচালার একটি ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে মাকসুদ আলমকে গ্রেফতার করে। পরে তল্লাশি চালিয়ে সেখান থেকে আরও ১৮ কেজি সিসা ও ২১টি হুক্কা উদ্ধার করা হয়।

মোহাম্মদ বদরুদ্দীন বলেন, গ্রেফতারকৃত দুই সহোদর বাংলাদেশি নাগরিক হলেও তাদের পূর্ব পুরুষ ইরানি। তারা দীর্ঘ সময় ইরানে অবস্থান করেছেন। সেখানে থাকার সময় তারা সিসা ব্যবসার কার্যক্রম, বাজারব্যবস্থা ও সরবরাহ পদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরে দেশে ফিরে একই ব্যবসায়িক মডেল অনুসরণ করে অনলাইনে সিসা বিক্রির নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেন।

তারা একটি ফেসবুক পেজ চালু করেন, যা বাংলাদেশে অনলাইনে সিসা বিক্রয়কারী প্রথম দিকের পেজগুলোর অন্যতম। ফেসবুকের মাধ্যমে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ, পণ্যের ছবি প্রকাশ, অর্ডার গ্রহণ, মূল্য নির্ধারণ এবং ডেলিভারির সমন্বয় করতেন। অর্ডার নিশ্চিত হওয়ার পর দেশীয় কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পার্সেল পাঠাতেন।

ডিএনসি জানায়, চক্রটি মূলত বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে পণ্যের মূল্য গ্রহণ করতো। বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত একাধিক মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তারা অর্থ সংগ্রহ করতো, যাতে প্রকৃত লেনদেনের উৎস ও সুবিধাভোগীদের পরিচয় গোপন রাখা যায়। ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এসব আর্থিক লেনদেন, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট এবং অর্থের প্রবাহ যাচাই করা হচ্ছে।

ডিএনসি আরও জানায়, অভিযানে জব্দ করা মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ডিভাইস এবং অনলাইন অ্যাকাউন্ট থেকে একটি বিস্তৃত গ্রাহক ডাটাবেজ উদ্ধার করা হয়েছে। এতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার অসংখ্য ক্রেতার তথ্য, যোগাযোগের ইতিহাস, অর্ডারের বিবরণ এবং লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে।

এসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিয়মিত ক্রেতা, পরিবেশক, সহযোগী এবং এই নেটওয়ার্কের অন্যান্য সদস্যকে শনাক্ত করার কাজ চলছে।

Share This