বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ দায়বদ্ধ সরকারের

বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ দায়বদ্ধ সরকারের

নিজস্ব প্রতিবেদক : July 12, 2026

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় সরকার সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে দেশের প্রতিটি বন্যার্ত মানুষের পাশে রয়েছে। জনগণের নির্বাচিত এই সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও গভীর মমত্ববোধ নিয়ে বন্যার্ত মানুষের সুরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তরা দ্রুতই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরে পাবে। আশাবাদের এই কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

শনিবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দেশব্যাপী চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া নানা উদ্যোগ ও দিকনির্দেশনা তুলে ধরে তিনি এ কথা জানান।

দেশজুড়ে প্রবল বৃষ্টিপাতের ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন স্থানে বন্যা, পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান-এই পাঁচটি জেলায় জনমানুষের অবর্ণনীয় কষ্টের সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক এই পরিস্থিতি নিজে এবং তাঁর টিম মেম্বারদের মাধ্যমে মনিটরিং করছেন।

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এই পাঁচ জেলার স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, ডিসি, এসপি, সিভিল সার্জন ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। রবিবারও (আজ) প্রধানমন্ত্রী দেশের সব বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবেন। উদ্ধার তৎপরতায় ডিসি, এসপি, ইউএনও থেকে শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর প্রতিটি পর্যায়ের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে দুই কোটি টাকারও বেশি অর্থনৈতিক অনুদান নিশ্চিত করেছেন, যা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারের কাছে চাল ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার বিরামহীন প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

মাহদী আমিন বলেন, ‘বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এরই মধ্যে চট্টগ্রামে অবস্থান করে পরিস্থিতি সরাসরি মনিটর করছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতারা তৃণমূল পর্যায়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর পুরো দল এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে সাধারণ মানুষের পাশে থেকে উদ্ধার ও ত্রাণ কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত হওয়ার আহবান জানিয়েছেন এবং তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত গৃহস্থালি, কৃষি, মৎস্য ও গবাদি পশু খামারিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ শুরু হয়েছে। দ্রুতই খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালু করা হবে। বর্তমানে সচল থাকা এক হাজারেরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্রে খাদ্য, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাকে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কিছু জায়গায় মোবাইল নেটওয়ার্ক বিঘ্নিত হলেও সংযোগ পুনঃস্থাপনে স্থানীয় প্রশাসন ও নেতাকর্মীরা কাজ করছেন।’

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা ও শাহাদত হোসেন স্বাধীন, সহকারী প্রেস সচিব মো. নাজমুল হক খান ও আবদুল্লাহ আল মাহমুদ শাহরিয়ার উপস্থিত ছিলেন।

মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সঠিক চিকিৎসা স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা ফেরাতে পারে : প্রধানমন্ত্রী

চিকিৎসার জন্য বিদেশে নয়, দেশীয় চিকিৎসাসেবার ওপর যাতে জনগণ আস্থা রাখতে পারে, সেই উদ্যোগ নিতে চিকিৎসকদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রী গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ডিএমসি) অডিটরিয়ামে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নে ডিএমসিয়ানদের ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময়সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ দেশ থেকে বহু মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন চিকিৎসা করাতে। ফলে প্রতিবছর কমবেশি পাঁচ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে চিকিৎসার খরচে। দেশের মানুষের এই চিকিৎসা আমরা কেন দেশে করাতে পারব না? আমরা কেন মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারব না? এটা আইন প্রয়োগ করে হবে না। কেবল চিকিৎসকরাই পারবেন তাঁদের মানবিক অ্যাপ্রোচ আর সঠিক চিকিৎসাদানের মাধ্যমে দেশের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস সম্পূর্ণ ফিরিয়ে আনতে। তাই চিকিৎসকদের প্রতি আহবান থাকবে, রোগীর আস্থা অর্জনে আরো মানবিক হোন।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এই মেডিক্যাল কলেজের ৪৩তম ব্যাচের ছাত্রী ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর আগমনে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রী নিজে গাড়ি চালিয়ে তাঁর সহধর্মিণীকে নিয়ে মেডিক্যাল কলেজে আসেন। প্রথমে তিনি বেলুন উড়িয়ে এমসি ডের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এরপর সহধর্মিণীকে নিয়ে যান কাজী ফজলুল হক মহিলা হোস্টেলে। অধ্যয়নের সময় এই হোস্টেলেই ছিলেন জুবাইদা রহমান। সেখানে উল্লসিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহধর্মিণী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ভাষা আন্দোলনে অবদান রেখেছে, ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছে। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে সফল করার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে এবং সব শেষে আমরা দেখেছি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অর্থাৎ জুলাই আন্দোলনে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের প্রত্যেক চিকিৎসক, প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারী কিভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছিলেন; কিভাবে সেদিন আহত ও শহীদ মানুষগুলোর পাশে তাঁরা দাঁড়িয়েছিলেন, চিকিৎসা দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।’

চিকিৎসকদের মহান পেশার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের আমরা এমন একজন মানুষ হিসেবে চিন্তা করি, যার কাছে ভরসা পাই। মানুষ আপনাদের কাছে যায় বিপদে পড়ে, ভরসার আশ্রয়স্থল মনে করে। চিকিৎসকরাই রোগে-শোকে কাতর মানুষের বড় বন্ধু হয়ে ওঠেন। আমি আমার জীবনেও এটি উপলব্ধি করেছি। এ দেশেরই প্রখ্যাত কয়েকজন চিকিৎসক আমার মাকে (বেগম খালেদা জিয়া) অনেক বছর ধরে চিকিৎসা দিয়েছেন। প্রতিটি মুহূর্তে উনারা তাঁকে টেককেয়ার করেছেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে উনি বিদেশে গিয়েছিলেন। আমাদের মধ্যে ডিবেট হচ্ছিল, আবার উনাকে বিদেশে নেব কি নেব না। আমি বলেছিলাম, উনাকে তো নিতে চাচ্ছেন, কিন্তু এখানে চিকিৎসকরা চব্বিশটা ঘণ্টার প্রতিটি মুহূর্তে যে সেবাটা দিচ্ছেন, বিদেশে গেলে হয়তো টেকনিক্যাল সাপোর্টটা ভালো পাওয়া যাবে, ভালো অ্যাডভান্স ইকুইপমেন্ট সেখানে আছে, তবে ওষুধপত্রের ব্যাপারে হয়তো খুব ডিফারেন্স থাকবে না। কিন্তু এই যে হিউম্যান টেককেয়ার, যেটা আমি মনে করি না এটা বিদেশে গেলে পাওয়া যাবে।’ বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত চিকিৎসকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বছর জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতের পর সবচেয়ে বেশি চিকিৎসা খাতেই বরাদ্দ রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে, পাঁচ বছরের মধ্যে এটি জিডিপির ৫ শতাংশে নিয়ে যাব।’

অনুষ্ঠানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণার বিষয়ে সরকারের উদ্যোগের কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তারেক রহমান উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন। শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যার কথা মন দিয়ে শোনেন।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস প্রমুখ।

Share This