ফেনী জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে অবস্থিত একটি কৌশলগত অঞ্চল। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মাঝামাঝি অবস্থান, শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম এবং উদ্যোক্তা মানসিকতার কারণে এ জেলার সম্ভাবনা ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ফেনী তার প্রবাসী আয়, কৃষি উৎপাদন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ফেনীর তরুণদের মধ্যে স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতির বিকাশের একটি নতুন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে ।
বিশ্বব্যাপী তরুণ উদ্যোক্তারা এখন অর্থনীতির গতি নির্ধারণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, সিঙ্গাপুর কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোতে তরুণদের তৈরি স্টার্টআপ আজ বিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশেও একই ধারা শুরু হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় আড়াই হাজারেরও বেশি স্টার্টআপ দেশে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তাদের মধ্যে অনেকেই প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগে নতুন সমাধান দিচ্ছে। Dhaka এবং Chattogram এখনো প্রধান কেন্দ্র হলেও ফেনীর মতো জেলাগুলোতেও উদ্যোক্তা সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ছে।
ফেনীর তরুণদের মধ্যে অনেকে ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, অনলাইন রিটেইল, কৃষি প্রযুক্তি এবং হেলথটেকের মতো খাতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ফেনী কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণে আগ্রহী করে তুলেছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনীতিতে রূপ দিতে এখনো বেশ কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থায়নের সুযোগের অভাব, দক্ষতার ঘাটতি এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের অনুপস্থিতি।
অনেক তরুণ ভালো ধারণা নিয়েও এগিয়ে যেতে পারে না, কারণ শুরুতেই আর্থিক সহায়তা মেলে না। পরিবারের ভয়, সামাজিক অনীহা এবং অভিজ্ঞ পরামর্শকের অভাবও তাদের বাধা । অন্যদিকে, ফেনীতে এখনো এমন কোনো ইনোভেশন হাব বা কো-ওয়ার্কিং স্পেস নেই যেখানে তরুণরা কাজ করতে পারবে, আইডিয়া ভাগাভাগি করতে পারবে বা মেন্টরশিপ পাবে।
তবুও, পরিস্থিতি পরিবর্তনের সুযোগ এখনো উন্মুক্ত। ফেনীতে যদি একটি জেলা-ভিত্তিক স্টার্টআপ ও ইনোভেশন হাব গঠন করা যায় – যেখানে তরুণরা বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ, মেন্টরিং ও নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ পাবে। তাহলে পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যেই জেলার অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। স্থানীয় সরকার ও ব্যবসায়িক সংগঠন একসঙ্গে উদ্যোগ নিলে, এটি বাস্তবায়ন সম্ভব।
বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে "Startup Bangladesh Limited" এবং "iDEA Project" চালু করেছে, যা জাতীয় পর্যায়ে স্টার্টআপদের সহায়তা করছে। এখন সময় এসেছে এই প্রোগ্রামগুলোকে জেলা পর্যায়ে সম্প্রসারিত করার। ফেনীর মতো জেলায় “Feni Young Innovator Grant” নামে একটি বার্ষিক মাইক্রো-ফান্ড চালু করা যেতে পারে, যেখানে ২০-৩০ জন তরুণ উদ্যোক্তা ১ থেকে ৩ লক্ষ টাকার সিড গ্র্যান্ট পেতে পারে। পাশাপাশি, প্রবাসী উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে “Returnee Entrepreneur Scheme” চালু করা যেতে পারে, যাতে তারা নিজ জন্মভূমিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন।
এছাড়া ফেনীর নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষভাবে প্রণোদনা দিতে হবে। নারী উদ্যোক্তারা অনলাইন ব্যবসা ও সেবাখাতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেন যদি যথাযথ প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল মার্কেটিং জ্ঞান ও ঋণ সুবিধা পাওয়া যায়।
যুবসমাজের জন্য উদ্যোক্তা সংস্কৃতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক পরিবর্তনেরও হাতিয়ার। একজন তরুণ যখন একটি ব্যবসা শুরু করে, তখন সে নিজের জীবনের দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি আরও কিছু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। ফেনীর মতো জেলায় যেখানে অনেক শিক্ষিত তরুণ কর্ম সংস্থানের অপেক্ষায়, সেখানে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতের অর্থনীতির রূপরেখা পাল্টে দিতে পারে।
তরুণদের উদ্যোক্তা চেতনা জাগ্রত করতে এখন প্রয়োজন দৃষ্টি ভঙ্গির পরিবর্তন। ব্যর্থতাকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা, সাফল্যকে ধৈর্য ও পরিকল্পনার ফল হিসেবে দেখা। ফেনীর তরুণরা যদি স্থানীয় সমস্যার প্রযুক্তি নির্ভর সমাধান তৈরি করে। যেমন কৃষিপণ্য সরাসরি বিক্রির প্ল্যাটফর্ম, স্থানীয় স্বাস্থ্য সেবা প্রযুক্তি বা শিক্ষা বিষয়ক উদ্ভাবন – তবে তারা দেশজুড়ে প্রভাব ফেলতে পারবে।
ফেনী এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন ছোট ছোট পদক্ষেপ বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক সংগঠন যদি যৌথভাবে কাজ করে, তবে আগামী দশকে ফেনী বাংলাদেশের একটি আঞ্চলিক স্টার্টআপ হাবে রূপ নিতে পারে। যেখানে তরুণরাই হবে উন্নয়নের মূল চালিকা শক্তি।