ঢাকা মেডিকেল কলেজ বিশ-পঁচিশ বছর পরে ‘দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হবে’ এমন প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক শিক্ষার্থী ও প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিনী ডা. জুবাইদা রহমান।
শনিবার (১১ জুলাই) ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ‘ডিএমসি ডে’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্যে নিজের এই প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করেন তিনি।
ডা. জুবাইদা বলেন, ‘আগামী ২০ বা ২৫ বছর পরে আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চাই।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজের কৃতি শিক্ষার্থী চিকিৎসক জুবাইদা রহমান বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আগামী অধ্যায়টি শুধু অতীতের গৌরবের ধারাবাহিকতা নয়। এটি হবে নতুন উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণায় উৎকর্ষ এবং মানবিক নেতৃত্বের এক নতুন অধ্যায়। আজ আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছি। কর্মক্ষেত্র ভিন্ন কিন্তু আমাদের পরিচয়ের শিকড় এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হোক একটি সেন্টার অব এক্সিলেন্স অ্যান্ড কমপ্যাশন ফর পেশেন্টস। একটি আশ্বস্ত করার বাক্য একটি ওষুধের মতো কাজ করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভিত্তি জ্ঞান হলেও চিকিৎসা পেশার প্রকৃত ভিত্তি মানবিকতা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা যতই প্রযুক্তি নির্ভর হোক না কেন তার কেন্দ্রবিন্দুতে সবসময় মানুষই থাকে।’
ডা. জুবাইদা বলেন, ‘এখন সময় এসেছে অ্যালামনাইকে শুধু স্মৃতির বন্ধনে নয়, দায়িত্বের বন্ধনে যুক্ত থাকতে হবে। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি তার অবকাঠামোতে, তার মানুষের মধ্যে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মেধা তার মূল্যবোধ এবং তার মানুষিকতার মধ্যে। প্রতিযোগিতার মধ্যেও সহযোগিতা অন্যতম সম্পদ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতিটি সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে একজন মানুষ, একটি পরিবার বা জীবন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ডা. শামসুল আলম খান মিলন মিলনায়তনে কলেজটির ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ ডে’ আয়োজন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিনী এই কলেজের ৪৩তম ব্যাচের ছাত্রী ছিলেন জুবাইদা রহমান। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে তার আগমনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে তার সহধর্মিনী জুবাইদা রহমানকে নিয়ে মেডিকেল কলেজে আসেন। প্রথমে বেলুন উড়িয়ে ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ডিএমসি ডে’র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তার সহধর্মিণীকে নিয়ে যান কাজী ফজলুল হক মহিলা হোস্টেলে। এই হোস্টেলের ছাত্রী ছিলেন জুবাইদা রহমান। সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণী।
১৯৪৬ সালের এই দিনে মাত্র ১০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের যাত্রা শুরু হয়েছিল।
অনুষ্ঠানে প্রথম দুই ঘণ্টা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভাবনা শীর্ষক মতিবিনিময় সভা হয়। এতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীরা তাদের ভাবনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিল্পীর আঁকা আলোকচিত্র উপহার দেওয়া হয়।
আলোচনা সভার মূল অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে দুই ছাত্রী হলের চলমান প্রকল্পের তথ্যাদি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী অবহিত হন।
পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমান ক্যাম্পাসে দুটি গাছের চারা রোপণ করেন।
‘স্মৃতিচারণ…’
বক্তব্যের শুরুতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে জুবাইদা রহমান তার বক্তব্য শুরু করেন।
চিকিৎসক জুবাইদা রহমান বলেন, ‘বহুদিন ধরে একটি আর্তনাদ আমার কানে ধ্বনিত হয় …সেই আর্তনাদ একজন রোগীর পরিবারের সদস্যের। মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ হওয়ায় সুষ্ঠু ডায়াগনোসিসে ব্যর্থ আমাদের ওয়ার্ডের সবাই। কারণ সিটি স্ক্যান মেশিন সেদিন অকেজো ছিল। শত প্রচেষ্টার পরও সেই ব্যক্তিকে বাঁচানো যায়নি। থার্ড ইয়ার, ফোর্থ ইয়ার, ফিফথ ইয়ারে পরবর্তীতে ইন্টার্নিশিপের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অনেক সময় দেখেছি এবং উপলব্ধি করেছি সেই অসহায়ত্ব।’
তিনি আরও বলেন, ‘পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে রোটেশনের সময় দুই চোখ অন্ধ ছোট্ট শিশু পেট্রোলজি অব ফ্যাটের রোগী…. সে কেমন করে যেন বুঝতে পারতো আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তাকেও হারাই অপারেশনের টেবিলে। অথবা অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত একজন গৃহকর্মী যে যন্ত্রণায় চিৎকার করতো; অন্য রোগীদের অনুরোধে তাকে বারান্দায় শত গরম থাকা সত্ত্বেও ভালো জায়গায় নেওয়া যায়নি।’
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ‘গাইনোকলজি অ্যান্ড অবস্ট্রনিক রোটেশনের সময় সেই দিনের কথা প্রায়ই মনে পড়ে যখন আল্ট্রাসনোগ্রামে অষ্টম কন্যা শিশু হবে এই ভেবে স্ত্রীকে একাকী ওয়ার্ডে রেখে যায় জীবনের বোঝায় মুহ্যমান স্বামী। কিন্তু শিশুটি জন্ম নেওয়ার পর দেখা যায় সেটি পুত্র সন্তান এবং শ্বাস নিতে পারছে না। নিয়ে গেলাম পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে। ইনকিউবেটরে শিশুটি বাঁচে এবং পরবর্তীতে গোটা পরিবার একসঙ্গে হওয়ায় স্বস্তি পাই। বর্তমানে নিশ্চয়ই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে চাকরি থেকে বরখাস্তের পর আর কখনো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসা হয়নি। কিন্তু আমরা চাই, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হোক একটি সেন্টার অব এক্সিলেন্স অ্যান্ড কমপ্যাশন ফর পেশেন্টস।’