বছরের শেষ নাগাদ এল নিনো শক্তিশালী থেকে ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই আবহাওয়া পরিস্থিতির প্রভাব আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকতে পারে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
বৃহস্পতিবার ব্লিউএমও জানায়, চলতি বছরের শেষ দিকে এল নিনো সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
এর সরাসরি প্রভাব ছাড়াও জলবায়ুতে সৃষ্ট পরিবর্তন ২০২৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এ সময় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, খরা ও তীব্র তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এল নিনো কী?
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুপ্রক্রিয়া। সাধারণত মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এর প্রভাবে বায়ুমণ্ডলীয় চাপ, বৃষ্টিপাত ও বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন আসে। এর প্রভাব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনোর আবির্ভাব ঘটে এবং একটি পর্ব প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হতে পারে। এটি নিজে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট কোনো প্রক্রিয়া নয়। তবে পৃথিবীর সামগ্রিক উষ্ণতা বাড়তে থাকায় শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্রভাবে অনুভূত হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে। এর সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা নতুন মাত্রায় পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে চরম আবহাওয়ার ঘটনাও আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ইতোমধ্যে বাড়ছে এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রাও ঊর্ধ্বমুখী। একই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বকে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। এই প্রতিযোগিতায় মানবজাতিকেই জয়ী হতে হবে।
এল নিনো সাধারণত বছরের শেষ দিকে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়। প্রশান্ত মহাসাগরে জমা অতিরিক্ত তাপ ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ার ফলে পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রার ওপর এর প্রভাব পড়ে। সর্বশেষ শক্তিশালী এল নিনোর পর ২০২৪ সালকে রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে দেখা হয়েছে।
ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেছেন, এল নিনো বিশ্বের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। খরা ও বন্যার কারণে এরই মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে বিপর্যয় ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এল নিনোর তীব্রতা বাড়লে এসব প্রভাব আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বিশেষ করে কৃষি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও পানিসম্পদের মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতগুলোকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষগুলোকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং পানি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। এল নিনোর প্রভাব কোন অঞ্চলে কীভাবে পড়বে, তা ভিন্ন হতে পারে। তাই সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে এখন থেকেই প্রস্তুত থাকার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থাগুলো।